ঢাকা ০৭:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

ভূরাজনৈতিক গুরুত্বে বাংলাদেশ এখন প্রভাবশালী, সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ভারত সতর্ক হবে: ইকরাম সেহগাল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫২:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল। তার মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকির দিক থেকে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে বেশি নাজুক। বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ভারত এ দেশের দিকে তাকানোর আগে অন্তত দুবার ভাববে। সম্প্রতি পাকিস্তান সফররত একটি বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব মন্তব্য করেন এবং বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ যেকোনো সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

ইকরাম সেহগাল আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। তবে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এর পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং কারা অর্থায়ন করছে তা সবারই জানা।

তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতকে বাংলাদেশের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরের কারণে ভারত তার ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় আছে। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। সামরিক শক্তি বাড়লে ভারত বাংলাদেশের দিকে তাকানোর আগে অন্তত দুবার ভাববে।

এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক দুদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়সহ যেকোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল সফিউল্লাহ, জেনারেল এরশাদসহ সমসাময়িক অনেক জেনারেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি চান, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আরও শক্তিশালী ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা পালন করুক।

ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক প্রসঙ্গে ইকরাম সেহগাল বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম দুই মুসলিম দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা কাজে লাগানো প্রয়োজন। তার মতে, ‘দুই দেশ এক জাতি’-এর ধারণা ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ভিত্তি হতে পারে। তবে এই ধারণার বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য ভিসা পদ্ধতি তুলে দেওয়া, দুদেশের মধ্যে অবাধ ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য, টাকা ও রুপির সহজ বিনিময়সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান জরুরি। প্রতিবেশী ভারত, বিশেষ করে দিল্লির শাসকগোষ্ঠী বিজেপি-আরএসএস, দুই মুসলিম দেশকে এতটা ঘনিষ্ঠ হতে দেবে না, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের কোণঠাসা করা।

একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, একাত্তরে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এ নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তবে সামনে এগিয়ে যেতে এই বেদনার স্মৃতি পেছনে ফেলে যেতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের বেদনাকে পাকিস্তানের ভাগ করে নেওয়া উচিত। তিনি দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন নেই। যে দলই ক্ষমতায় থাকবে তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে এবং সম্পর্কের ভিত্তি হবে দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক অংশীদারত্ব।

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে ইকরাম সেহগাল বলেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে হবে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার পাশাপাশি জনগণের মতামত সত্যিকারভাবে প্রতিফলিত হবে।

সার্ক কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ভারতের অসহযোগিতার কারণে সার্ক আজ অকার্যকর হয়ে আছে। সার্ক কার্যকর না থাকায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বৈরিতা বেড়েই চলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সার্ককে কার্যকর করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি আশা করেন, একদিন ভারত তার ভুল বুঝতে পারবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে এগিয়ে আসবে। তবে সার্ক অকার্যকর থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো সার্কের বিকল্প ভাবতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে তার গভীর আবেগপ্রবণ স্মৃতির কথা তুলে ধরে ইকরাম সেহগাল বলেন, তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে। তার বাবা সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন এবং তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কুমিল্লায়। পরে সিলেট ও ঢাকায়ও তিনি পড়াশোনা করেছেন। বাংলাদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক-বেসামরিক আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার আজও যোগাযোগ রয়েছে। তিনি প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। নিজের মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ইকরাম সেহগাল বলেন, তার মা বগুড়ার মেয়ে। মায়ের কারণে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তার আলাদা আবেগ রয়েছে। তিনি বলেন, যখনই কোনো বাংলাদেশির দেখা পান, তখন তার মনে হয় এরা তার মায়ের দেশ থেকে এসেছেন, তাই তার কাছে বাংলাদেশিদের অবস্থান অন্যদের থেকে আলাদা।

পাকিস্তানের এক্সটারনাল পাবলিসিটি উইংয়ের মহাপরিচালক রাইসা আদিলের সভাপতিত্বে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ইকরাম সেহগাল বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি, সার্কসহ আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন। রাইসা আদিল বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ককে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেন, আমাদের সম্পর্কের অন্যতম মূলভিত্তি অভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তিনি দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অবাধ যাতায়াত ও সহযোগিতা জরুরি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে দুদেশের সম্পর্কের ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে। তিনি যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় পাকিস্তানের সহযোগিতার আশ্বাস

এদিকে, বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডেটাবেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি (নাদরা)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে বাংলাদেশি মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নাদরার চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মুনির আফসার এ আগ্রহের কথা জানান।

জেনারেল আফসার নাদরার কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, পাকিস্তানের নাগরিকদের ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া, সরকারি ডেটাবেসে সংবেদনশীল তথ্য সন্নিবেশন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার সুরক্ষিত রাখা নাদরার প্রধান কাজ। পাকিস্তানের বাইরে তারা আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবস্থাপনা, বায়োমেট্রিক, ই-পাসপোর্ট এবং নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনাসহ নাগরিকদের বিভিন্ন তথ্য হাতছাড়া হওয়ার খবর উদ্বেগজনক। ডেটাবেসের নিরাপত্তা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ডেটাবেস সুরক্ষার কাজে বিদেশি কাউকে সরাসরি রাখা ঠিক নয়, কেবল কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। জেনারেল আফসার সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের নাদরার যাবতীয় কার্যক্রম ঘুরিয়ে দেখান।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খেলার সূচি: আজ টিভিতে যেসব ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ দেখা যাবে

ভূরাজনৈতিক গুরুত্বে বাংলাদেশ এখন প্রভাবশালী, সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ভারত সতর্ক হবে: ইকরাম সেহগাল

আপডেট সময় : ০৮:৫২:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল। তার মতে, নিরাপত্তা ঝুঁকির দিক থেকে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে বেশি নাজুক। বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ভারত এ দেশের দিকে তাকানোর আগে অন্তত দুবার ভাববে। সম্প্রতি পাকিস্তান সফররত একটি বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব মন্তব্য করেন এবং বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ যেকোনো সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

ইকরাম সেহগাল আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। তবে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকটসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এর পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং কারা অর্থায়ন করছে তা সবারই জানা।

তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতকে বাংলাদেশের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরের কারণে ভারত তার ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় আছে। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত জরুরি। সামরিক শক্তি বাড়লে ভারত বাংলাদেশের দিকে তাকানোর আগে অন্তত দুবার ভাববে।

এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক দুদেশের সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সামরিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, পারস্পরিক প্রশিক্ষণ বিনিময়সহ যেকোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল সফিউল্লাহ, জেনারেল এরশাদসহ সমসাময়িক অনেক জেনারেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি চান, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আরও শক্তিশালী ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভূমিকা পালন করুক।

ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক প্রসঙ্গে ইকরাম সেহগাল বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম দুই মুসলিম দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা কাজে লাগানো প্রয়োজন। তার মতে, ‘দুই দেশ এক জাতি’-এর ধারণা ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ভিত্তি হতে পারে। তবে এই ধারণার বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং। এর জন্য ভিসা পদ্ধতি তুলে দেওয়া, দুদেশের মধ্যে অবাধ ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য, টাকা ও রুপির সহজ বিনিময়সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিষ্পন্ন বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান জরুরি। প্রতিবেশী ভারত, বিশেষ করে দিল্লির শাসকগোষ্ঠী বিজেপি-আরএসএস, দুই মুসলিম দেশকে এতটা ঘনিষ্ঠ হতে দেবে না, কারণ তাদের মূল লক্ষ্য মুসলিমদের কোণঠাসা করা।

একাত্তরের প্রসঙ্গ টেনে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, একাত্তরে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এ নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তবে সামনে এগিয়ে যেতে এই বেদনার স্মৃতি পেছনে ফেলে যেতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের বেদনাকে পাকিস্তানের ভাগ করে নেওয়া উচিত। তিনি দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন নেই। যে দলই ক্ষমতায় থাকবে তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে এবং সম্পর্কের ভিত্তি হবে দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক অংশীদারত্ব।

বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে ইকরাম সেহগাল বলেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে হবে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার পাশাপাশি জনগণের মতামত সত্যিকারভাবে প্রতিফলিত হবে।

সার্ক কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ভারতের অসহযোগিতার কারণে সার্ক আজ অকার্যকর হয়ে আছে। সার্ক কার্যকর না থাকায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বৈরিতা বেড়েই চলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সার্ককে কার্যকর করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি আশা করেন, একদিন ভারত তার ভুল বুঝতে পারবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে এগিয়ে আসবে। তবে সার্ক অকার্যকর থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো সার্কের বিকল্প ভাবতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে তার গভীর আবেগপ্রবণ স্মৃতির কথা তুলে ধরে ইকরাম সেহগাল বলেন, তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে। তার বাবা সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন এবং তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কুমিল্লায়। পরে সিলেট ও ঢাকায়ও তিনি পড়াশোনা করেছেন। বাংলাদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক-বেসামরিক আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে তার আজও যোগাযোগ রয়েছে। তিনি প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন। নিজের মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ইকরাম সেহগাল বলেন, তার মা বগুড়ার মেয়ে। মায়ের কারণে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি তার আলাদা আবেগ রয়েছে। তিনি বলেন, যখনই কোনো বাংলাদেশির দেখা পান, তখন তার মনে হয় এরা তার মায়ের দেশ থেকে এসেছেন, তাই তার কাছে বাংলাদেশিদের অবস্থান অন্যদের থেকে আলাদা।

পাকিস্তানের এক্সটারনাল পাবলিসিটি উইংয়ের মহাপরিচালক রাইসা আদিলের সভাপতিত্বে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ইকরাম সেহগাল বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি, সার্কসহ আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন। রাইসা আদিল বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ককে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেন, আমাদের সম্পর্কের অন্যতম মূলভিত্তি অভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। তিনি দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অবাধ যাতায়াত ও সহযোগিতা জরুরি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে দুদেশের সম্পর্কের ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে। তিনি যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় পাকিস্তানের সহযোগিতার আশ্বাস

এদিকে, বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডেটাবেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি (নাদরা)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে বাংলাদেশি মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নাদরার চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মুনির আফসার এ আগ্রহের কথা জানান।

জেনারেল আফসার নাদরার কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, পাকিস্তানের নাগরিকদের ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া, সরকারি ডেটাবেসে সংবেদনশীল তথ্য সন্নিবেশন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার সুরক্ষিত রাখা নাদরার প্রধান কাজ। পাকিস্তানের বাইরে তারা আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও সুদানের মতো দেশগুলোতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবস্থাপনা, বায়োমেট্রিক, ই-পাসপোর্ট এবং নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থায় কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনাসহ নাগরিকদের বিভিন্ন তথ্য হাতছাড়া হওয়ার খবর উদ্বেগজনক। ডেটাবেসের নিরাপত্তা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের ডেটাবেস সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ডেটাবেস সুরক্ষার কাজে বিদেশি কাউকে সরাসরি রাখা ঠিক নয়, কেবল কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। জেনারেল আফসার সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের নাদরার যাবতীয় কার্যক্রম ঘুরিয়ে দেখান।