বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা ক্ষুদ্র তালপট্টি দ্বীপকে ঘিরে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের যে জোরালো দাবি উঠেছিল, তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর নবীন বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আজও নানা কারণে অমীমাংসিত আলোচনার জন্ম দেয় এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গোপসাগরের হারিয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় পলি জমে নতুন একটি ভূখণ্ড জেগে ওঠে। বাংলাদেশের কাছে এটি পরিচিতি পায় তালপট্টি দ্বীপ নামে, আর ভারত এটিকে নিউ মুর দ্বীপ বা পূর্বাশা নামে অভিহিত করে। প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটিকে ঘিরে দু’দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তালপট্টি দ্বীপের ওপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় অবস্থান নেয়। তৎকালীন সরকার আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এই দ্বীপকে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয় যে, এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক আইন ও ভূ-তাত্ত্বিক উপাত্তের ভিত্তিতে এর ওপর বাংলাদেশেরই সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সে সময় জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে তালপট্টিকে ঘিরে ব্যাপক জনমত তৈরি হয় এবং সরকারের পদক্ষেপগুলো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠায় এবং নিজেদের দাবি জোরালো করে। যদিও এ নিয়ে কোনো সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি, তবে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছিল চরমে। বাংলাদেশের জনগণও এই ইস্যুতে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল, যা জাতীয় ঐক্যের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
পরবর্তীকালে, প্রাকৃতিক কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে তালপট্টি দ্বীপ ধীরে ধীরে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। ২০১১ সালের দিকে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, দ্বীপটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে চলে গেছে। ভৌগোলিকভাবে দ্বীপটি অদৃশ্য হয়ে গেলেও, এর ঘিরে থাকা সমুদ্রসীমা ও অধিকারের প্রশ্নটি দীর্ঘকাল অমীমাংসিত ছিল। অবশেষে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর এই বিতর্কের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। তবে, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে তালপট্টি দ্বীপের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে, যা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে নানা শিক্ষণীয় দিক উন্মোচন করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, কীভাবে একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডও জাতীয় আত্মমর্যাদা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 


















