নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ‘গঞ্জে আলী খাল’ দখলের অভিযোগ উঠেছে। ফতুল্লা থেকে শুরু করে শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই খালের একাংশ ভরাট করে সেখানে একটি ট্যাক্সি ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড তৈরির তোড়জোড় চলছে। এই উদ্যোগের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন বিএনপি নেতার নাম আসায় সাধারণ নগরবাসী ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফতুল্লার চানমারি রেললাইন সংলগ্ন গঞ্জে আলী খালের প্রবেশমুখে ‘নারায়ণগঞ্জ জেলা মাইক্রোবাস ও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড মালিক ও শ্রমিক কমিটি’র পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি ব্যানার টাঙানো হয়েছে। সেখানে জায়গাটিকে ‘প্রস্তাবিত ট্যাক্সি স্ট্যান্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ব্যানারে এই সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুসহ জেলা ও মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষস্থানীয় ১৩ জন নেতার নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি ফতুল্লার চানমারি থেকে শুরু হয়ে তল্লা ও হাজিগঞ্জ এলাকা দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে মিশেছে। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে এই খালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের পর খালের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয়েছিল এবং এলাকায় জলাবদ্ধতা কমেছিল। এখন যদি খালটি ভরাট করে স্ট্যান্ড করা হয়, তবে বর্ষা মৌসুমে চানমারি, তল্লা, হাজিগঞ্জ ও চাষাড়া এলাকা দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে।
খাল দখলের এই প্রচেষ্টাকে শহরের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা। গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রধান সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন বলেন, গঞ্জে আলী খাল এই শহরের প্রাণ। এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
এ বিষয়ে সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু জানান, বর্তমানে তাদের স্ট্যান্ডটি সেনাবাহিনীর জায়গায় অবস্থিত এবং সেখান থেকে তাদের সরে যেতে বলা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে তারা খালের পাশের এই জায়গাটির জন্য লিজের আবেদন করেছেন। তবে খালের অস্তিত্ব বিলীন করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা। বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা জানান, জলাশয় বা খালের জায়গা ভরাট করে কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা বা স্ট্যান্ড করার অনুমতি দেওয়ার বিধান নেই। গত কয়েক মাসে এমন কোনো লিজ দেওয়া হয়নি এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
এদিকে, উপদেষ্টা পরিষদে নাম থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসকুল ইসলাম রাজীব এবং মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজলসহ কয়েকজন নেতা। তারা জানান, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের নাম হয়তো ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তারা এই সংগঠনের কোনো কর্মকাণ্ড বা খাল দখলের উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত নন।
উল্লেখ্য, গঞ্জে আলী খালটি নারায়ণগঞ্জের একটি ঐতিহাসিক জলাধার। এটি কেবল পানি নিষ্কাশন নয়, বরং শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও অপরিহার্য। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করে পরিবহন স্ট্যান্ড নির্মাণের উদ্যোগকে নগরীর অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। তারা অনতিবিলম্বে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
রিপোর্টারের নাম 























