ঢাকা ০৩:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

সাইবার সন্ত্রাসের জালে উদীয়মান নারী নেতৃত্ব: আগামীর পথচলা কতটা মসৃণ?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের উপস্থিতি বরাবরই তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক নানা সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন যখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই রাজনীতির ময়দানে আসা নবীন নারী নেতৃত্ব এক নজিরবিহীন সংকটের সম্মুখীন। মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইবার সন্ত্রাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপপ্রয়োগ। চরিত্রহনন, হুমকি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে আগামীর নারী নেতৃত্বকে থামিয়ে দেওয়ার এক সুসংগঠিত অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশেষ করে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে অনলাইনে আপত্তিকর প্রচারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ কয়েকজন নারী প্রার্থী অভিযোগ করেছেন যে, তাদের কণ্ঠরোধ করতে পরিকল্পিতভাবে সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং চারিত্রিক অবমাননার শিকার হতে হচ্ছে। তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আসা তরুণ নারীনেত্রীরা অবর্ণনীয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। শুধু আমাদের সংগঠন নয়, সব দলের নারীনেত্রীরাই এই হুমকির শিকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে এআইয়ের ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআইয়ের মাধ্যমে বানোয়াট ভিডিও তৈরি হচ্ছে এবং অনুষ্ঠানের ভিডিও বিকৃত করে ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

সামান্তা শারমিন আরও জানান, তাদের দলের ধানমন্ডি থানার যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত আরা রুমিকে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ জানানোর পরও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গানম্যান দিয়ে টার্গেট কিলিং বন্ধ করা যায় না। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, নারীনেত্রীদের ঝুঁকি ততই বাড়বে। বর্তমান নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি মোটেও সহনীয় নয়।”

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের শিক্ষার্থী মহুয়া জানান, ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নারী শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং ইস্যুটি নিয়ে কাজ করবেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী সুইটি আক্তার বলেন, নারী প্রার্থীদের প্রায়শই ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে বুলিংয়ের চেষ্টা করা হয় এবং নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীভুক্ত বলে অপপ্রচার চালানো হয়।

ঝালকাঠি-১ আসনের এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতু বলেন, অনলাইন হয়রানি তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবি—সবই তাকে সহ্য করতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাজনীতিতে নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে তাদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি অপকৌশল। ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্মগুলো ভুয়া তথ্যের অসাড়তা প্রমাণ করলেও, সংশোধনী আসার আগেই ক্ষতি হয়ে যায় বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

আপ বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরাও একই সুর ধ্বনিত করেন। তিনি বলেন, পুরুষ রাজনীতিবিদদের সমালোচনা তাদের কাজের ভিত্তিতে হলেও, নারীর ক্ষেত্রে তা চরিত্রের উপর গিয়ে পড়ে। প্রযুক্তির কল্যাণে এই অত্যাচার দ্বিগুণ হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে মানুষ যাচাই না করেই প্রচার করে। আইনের আশ্রয় নিলেও প্রতিকার খুব বেশি হয়নি, কারণ সমাজে এ বিষয়গুলো নিয়ে সিরিয়াস পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা নেই।

নাটোর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল দাবি করেন, ভুয়া বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী সানজিদা তুলি জানান, সাইবার বুলিং এখন অনেক বেশি পদ্ধতিগত হয়ে উঠেছে এবং গত এক বছরে ‘বট’ নেটওয়ার্কের ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

সম্প্রতি শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নারী প্রার্থীরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অনলাইনে হয়রানির শিকারদের সহায়তায় একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা দ্রুত সেবাব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান। পাশাপাশি, এআই দিয়ে তৈরি মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতে মেটা ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।

ইউএন উইমেনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনলাইন হয়রানি তীব্রভাবে বেড়েছে এবং ৬৬ শতাংশ নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বা হুমকিমূলক বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে তাদের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিং, ১৮ শতাংশ আইডি হ্যাক, ১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইলিং এবং ৯ শতাংশ ইমপারসোনেশনের শিকার হয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪.৮৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর গবেষণা বলছে, দেশের ৭৮ শতাংশের বেশি নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোনো না কোনো সময় প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানির শিকার হন।

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী শামীমা তাসনিম বিষয়টিকে গভীর সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “জুলাইযোদ্ধা নারীদের মানসিক নির্যাতন, এআই দিয়ে অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে তাদের সামনের পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। শুধু তাই নয়, কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। সমাজ নারী জুলাইযোদ্ধাদের গতানুগতিক নারী মডেলে রাখতেই এই ধরনের কাজ করছে।”

এই ধরনের ঘটনা রোধে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরা খানম বলেন, সাইবার ক্রাইম অ্যাক্ট কার্যকর করা এবং অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিআইজি তাপতুন নাসরিন আশ্বাস দিয়েছেন যে, নারীরা রাজনীতিতে আসলে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তাদের সব ধরনের হুমকি-ধমকি ও পেশিশক্তির প্রয়োগকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ’-এর সিনিয়র ফ্যাক্ট চেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, নারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে ও তাদের মুখ বন্ধ রাখতে সুসংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অনলাইন প্রোপাগান্ডা রোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষায় দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকলে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষের স্থান থাকত না। তিনি বলেন, “নারীদের জন্য রাজনীতি একটি নিরাপদ ক্ষেত্র নয়—এটিই এক ভয়াবহ বাস্তবতা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই এখনো নারীবান্ধব নীতিমালা নেই এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দেখা যায় না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের পর যদি রাজনীতিতে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

২০২৬ সালের শান্তি নোবেলের দৌড়ে ২৮৭ প্রার্থী, আলোচনায় ট্রাম্পের নাম

সাইবার সন্ত্রাসের জালে উদীয়মান নারী নেতৃত্ব: আগামীর পথচলা কতটা মসৃণ?

আপডেট সময় : ০৯:২১:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের উপস্থিতি বরাবরই তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক নানা সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন যখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই রাজনীতির ময়দানে আসা নবীন নারী নেতৃত্ব এক নজিরবিহীন সংকটের সম্মুখীন। মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাইবার সন্ত্রাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপপ্রয়োগ। চরিত্রহনন, হুমকি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে আগামীর নারী নেতৃত্বকে থামিয়ে দেওয়ার এক সুসংগঠিত অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশেষ করে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে অনলাইনে আপত্তিকর প্রচারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ কয়েকজন নারী প্রার্থী অভিযোগ করেছেন যে, তাদের কণ্ঠরোধ করতে পরিকল্পিতভাবে সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং চারিত্রিক অবমাননার শিকার হতে হচ্ছে। তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আসা তরুণ নারীনেত্রীরা অবর্ণনীয় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। শুধু আমাদের সংগঠন নয়, সব দলের নারীনেত্রীরাই এই হুমকির শিকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে এআইয়ের ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এআইয়ের মাধ্যমে বানোয়াট ভিডিও তৈরি হচ্ছে এবং অনুষ্ঠানের ভিডিও বিকৃত করে ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

সামান্তা শারমিন আরও জানান, তাদের দলের ধানমন্ডি থানার যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত আরা রুমিকে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ জানানোর পরও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গানম্যান দিয়ে টার্গেট কিলিং বন্ধ করা যায় না। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, নারীনেত্রীদের ঝুঁকি ততই বাড়বে। বর্তমান নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি মোটেও সহনীয় নয়।”

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের শিক্ষার্থী মহুয়া জানান, ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নারী শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং ইস্যুটি নিয়ে কাজ করবেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী সুইটি আক্তার বলেন, নারী প্রার্থীদের প্রায়শই ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে বুলিংয়ের চেষ্টা করা হয় এবং নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীভুক্ত বলে অপপ্রচার চালানো হয়।

ঝালকাঠি-১ আসনের এনসিপির প্রার্থী মাহমুদা মিতু বলেন, অনলাইন হয়রানি তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবি—সবই তাকে সহ্য করতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাজনীতিতে নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে তাদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি অপকৌশল। ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্মগুলো ভুয়া তথ্যের অসাড়তা প্রমাণ করলেও, সংশোধনী আসার আগেই ক্ষতি হয়ে যায় বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

আপ বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরাও একই সুর ধ্বনিত করেন। তিনি বলেন, পুরুষ রাজনীতিবিদদের সমালোচনা তাদের কাজের ভিত্তিতে হলেও, নারীর ক্ষেত্রে তা চরিত্রের উপর গিয়ে পড়ে। প্রযুক্তির কল্যাণে এই অত্যাচার দ্বিগুণ হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে মানুষ যাচাই না করেই প্রচার করে। আইনের আশ্রয় নিলেও প্রতিকার খুব বেশি হয়নি, কারণ সমাজে এ বিষয়গুলো নিয়ে সিরিয়াস পদক্ষেপ নেওয়ার মানসিকতা নেই।

নাটোর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল দাবি করেন, ভুয়া বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অপরাধীদের পরিচয় প্রকাশ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী সানজিদা তুলি জানান, সাইবার বুলিং এখন অনেক বেশি পদ্ধতিগত হয়ে উঠেছে এবং গত এক বছরে ‘বট’ নেটওয়ার্কের ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

সম্প্রতি শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নারী প্রার্থীরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অনলাইনে হয়রানির শিকারদের সহায়তায় একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা দ্রুত সেবাব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান। পাশাপাশি, এআই দিয়ে তৈরি মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতে মেটা ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।

ইউএন উইমেনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনলাইন হয়রানি তীব্রভাবে বেড়েছে এবং ৬৬ শতাংশ নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বা হুমকিমূলক বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে তাদের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিং, ১৮ শতাংশ আইডি হ্যাক, ১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইলিং এবং ৯ শতাংশ ইমপারসোনেশনের শিকার হয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪.৮৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর গবেষণা বলছে, দেশের ৭৮ শতাংশের বেশি নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোনো না কোনো সময় প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানির শিকার হন।

সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভানেত্রী শামীমা তাসনিম বিষয়টিকে গভীর সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “জুলাইযোদ্ধা নারীদের মানসিক নির্যাতন, এআই দিয়ে অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে তাদের সামনের পথচলাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে। শুধু তাই নয়, কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। সমাজ নারী জুলাইযোদ্ধাদের গতানুগতিক নারী মডেলে রাখতেই এই ধরনের কাজ করছে।”

এই ধরনের ঘটনা রোধে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরা খানম বলেন, সাইবার ক্রাইম অ্যাক্ট কার্যকর করা এবং অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিআইজি তাপতুন নাসরিন আশ্বাস দিয়েছেন যে, নারীরা রাজনীতিতে আসলে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তাদের সব ধরনের হুমকি-ধমকি ও পেশিশক্তির প্রয়োগকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ’-এর সিনিয়র ফ্যাক্ট চেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, নারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে ও তাদের মুখ বন্ধ রাখতে সুসংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অনলাইন প্রোপাগান্ডা রোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষায় দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকলে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষের স্থান থাকত না। তিনি বলেন, “নারীদের জন্য রাজনীতি একটি নিরাপদ ক্ষেত্র নয়—এটিই এক ভয়াবহ বাস্তবতা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই এখনো নারীবান্ধব নীতিমালা নেই এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দেখা যায় না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের পর যদি রাজনীতিতে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।