আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন অধিকাংশ প্রার্থী। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে নাগরিকত্ব ইস্যুতে অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে তাদের সিংহভাগই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। একইসঙ্গে, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ তুলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের করা বেশ কিছু আবেদনও নাকচ করে দিয়েছে কমিশন।
ইসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে অভিযুক্ত ২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২১ জনের প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়েছে। বিপরীতে ৩ জনের আবেদন বাতিল করা হয়েছে এবং একজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। মূলত আইনজীবীদের আইনি মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে কমিশন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে যারা যথাযথ নিয়ম মেনে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন, হলফনামা সংযুক্ত করেছেন এবং নির্ধারিত ফি জমা দিয়েছেন, তাদের প্রার্থিতা বৈধ বলে গণ্য করা হয়েছে। ত্যাগের আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন থাকলেও সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে ইসি।
আপিল শুনানির সমাপনী বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, “আমরা কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই আইনানুগভাবে আপিল শুনানি সম্পন্ন করেছি। প্রার্থীরা শুনানিতে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, আশা করি ভোটের মাঠেও সেই শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।”
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানিয়েছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। প্রাথমিক বাছাইয়ে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে ৬৪৫টি আপিল জমা পড়ে। টানা ৯ দিনের শুনানি শেষে ৪২২টি আপিল মঞ্জুর করা হয় এবং ১৯৫টি নামঞ্জুর হয়। সব মিলিয়ে আপিল প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪২০ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ইসির এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা চাইলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন পরিচালনার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় মঙ্গলবার। পরদিন বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর করা আপিলটি নামঞ্জুর হয়। মিন্টু ছাড়াও বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম, আফরোজা খানম রিতা, কয়ছর এম আহমেদ এবং জামায়াতে ইসলামীর একেএম ফজলুল হক, ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহীসহ ২১ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে একই ইস্যুতে কুমিল্লা-১০ আসনের আব্দুল গফুর ভূঁইয়া, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের আজিজুর রহমান এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনের তানভীর আহমেদ রানার প্রার্থিতা বাতিল করেছে কমিশন।
দেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণে বাধা না থাকলেও জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা বাধ্যতামূলক।
এদিকে, কেবল নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের ভিত্তিতে মনোনয়ন বৈধ করার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন মামুন হাওলাদার নামে এক ভোটার। সিইসির কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে তিনি দাবি করেন, বিদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ত্যাগ না করা পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ইসির বর্তমান সিদ্ধান্ত সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী বলে তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেন। তবে কমিশন তাদের আইনি ব্যাখ্যায় অটল থেকে আপিল নিষ্পত্তি করেছে।
রিপোর্টারের নাম 















