দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ উধাও হয়ে গেছে। জানুয়ারির এই সময়ে দেশের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত ৩০ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই পরিস্থিতিতে চলতি মাসেই শীত বিদায় নিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশের একমাত্র পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সাধারণত আবহাওয়া অধিদপ্তরের তিনটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এলাকায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই হিসাবে, বর্তমানে দেশের কোথাও কোনো শৈত্যপ্রবাহ নেই; বরং নাটকীয়ভাবে দিন ও রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে, তবে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত তিন দশকের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জানুয়ারির এই সময়ে সাধারণত যে তাপমাত্রা থাকার কথা, দিনের বেলায় তার চেয়ে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি এবং রাতের বেলায় ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, চলতি মাসের প্রথম দিকে টানা কয়েকদিন ঘনকুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের পর গত সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ আশপাশের এলাকার বাতাসের জলীয়বাষ্প শোষণ করে নিয়েছে। এর ফলেই বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে হঠাৎ তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ নেই এবং তাপমাত্রা কমার তেমন কোনো লক্ষণও নেই।
শনিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় ফেনীতে, যা আগের দিন টেকনাফে ছিল ২৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন ৯.০ ডিগ্রি এবং রাজধানী ঢাকায় ১৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ২২ ও ২৩ জানুয়ারি তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও পরবর্তীতে তা আবার বাড়তির দিকেই থাকবে। ২৫-২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করতে পারে।
তবে চলতি শীত মৌসুমের শুরুটা ছিল ভিন্ন। গত ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির প্রথম দিকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সপ্তাহজুড়ে সূর্যের দেখা মেলেনি, যা দেখে মনে হয়েছিল এ বছর শীত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরও তখন অন্তত তিনটি শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছিল। অথচ মাঘ মাসের ৪ তারিখেই এসে প্রকৃতির এই পরিবর্তন জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’ প্রবাদটি যেন এবার তার অর্থ হারাচ্ছে।
শীতের এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেসা বলেন, কয়েকদিন আগে দেশের ৫০ থেকে ৫৪টি জেলায় একসঙ্গে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও বর্তমানে কোথাও তা নেই। মূলত ঘনকুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্যের তাপ বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী কয়েকদিনে দিনের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে আরও বাড়বে, ফলে শীতের দাপট আরও কমে আসবে। যদিও দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় শীতের প্রভাব কিছুটা বজায় থাকবে, তবে রাজধানীতে শীত ইতোমধ্যে কমে এসেছে এবং আগামী দুদিন পর দিনের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদ জেবুন্নেসা উল্লেখ করেন, কয়েকদিন আগে দিন ও রাতের তাপমাত্রায় মাত্র ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো খুব কম পার্থক্য ছিল, যা ৭৩ বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক ছিল। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই অবস্থা কেটে গিয়ে তাপমাত্রার পার্থক্য অনেকটাই বেড়ে গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সব মিলিয়ে বলছে, চলতি মাসের শেষ দিকে তাপমাত্রা আরও বেড়ে শীতের অনুভূতি আরও কমে যেতে পারে। সংস্থাটি যদিও সরাসরি ‘শীত বিদায় নিয়েছে’ বলতে রাজি নয়, তবে বর্তমান অবস্থা থেকে জানুয়ারির মধ্যেই শীতের মৌসুম শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথাই জানাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 















