শহরের এক কোলাহলপূর্ণ মোড়ে এক নিভৃত কারিগর বসেন। তাঁর সামনে একটি ছোট কাঠের টেবিল, যেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো নানা আকারের লেন্স ও কাচের টুকরো। তিনি কেবল চশমা সারাই করেন না, বরং মানুষের দৃষ্টিকে আরও স্বচ্ছ করে তোলেন। তাঁর কাছে ভিড় হয়, আবার কখনো কখনো টেবিলটি নিরিবিলিও থাকে।
একদিন এক যুবক সেখানে এলেন। তাঁর পরিধানে ছিল দামি পোশাক, চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি। তিনি বললেন, “সবকিছু ঝাপসা দেখি। মনে হয় চারপাশের পৃথিবীটা ধূসর হয়ে গেছে।”
কারিগর মৃদু হাসলেন, তাঁর হাসি ছিল হেমন্তের ঝরা পাতার মতোই শব্দহীন। তিনি যুবকের চশমা মুছলেন না, বরং তাঁর ঝুলি থেকে বের করলেন একটি ছোট স্ফটিক। বললেন, “এটি চোখের সামনে ধরুন। বাইরের জগৎ দেখার আগে ভেতরের জগৎটা একবার দেখে নিন।”
যুবক স্ফটিকটি চোখে ধরতেই এক বিশাল মরুভূমির দৃশ্য দেখতে পেলেন। সেখানে একটি ছোট চারাগাছ জলের অভাবে কাতর, অথচ তার পায়ের নিচেই বয়ে চলেছে স্বচ্ছ জলের ধারা। যুবক অবাক হয়ে তাকালেন। কারিগর ধীর কণ্ঠে বললেন, “যাকে আপনি দূরে খুঁজছেন, সে আপনার পায়ের নিচেই থাকে। কেবল নিচের দিকে তাকানোর অভ্যাস আমাদের নেই।”
এই কারিগর প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন কাচ দিতেন। কেউ সেই কাচে দেখতে পেত হারানো শৈশব, কেউ বা পেত আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনা। তিনি কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না; যা মানুষ দিত, তাইতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তবে তাঁর একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল – তিনি সবার চোখের অস্পষ্টতা দূর করলেও নিজের চোখ দুটি সর্বদা বন্ধ রাখতেন।
একদিন এক কৌতূহলী বৃদ্ধ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি সবার চোখের সামনে সত্যকে তুলে ধরো, কিন্তু নিজে চোখ বন্ধ করে রাখো কেন? তুমি কি অন্ধ?”
কারিগর এবারও হাসলেন। তিনি টেবিলের ওপর থেকে একটি পুরোনো দর্পণ তুলে বৃদ্ধের সামনে ধরলেন। বৃদ্ধ দর্পণে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন। দর্পণে কারিগরের কোনো প্রতিচ্ছবি ছিল না! সেখানে কেবল একটি শূন্য চেয়ার ও টেবিল পড়ে ছিল।
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, “এ কী! তুমি কোথায়?”
বাতাসে একটি নিবিড় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—”আমি তো কেউ নই। আমি মানুষের আত্মোপলব্ধির একটি ছায়া মাত্র। যখন কেউ নিজেকে চিনতে পারে, তখন আমার আর প্রয়োজন থাকে না।”
বৃদ্ধ চোখ রগড়ে আবার তাকালেন। দেখলেন, সামনে কোনো টেবিল নেই, কোনো কারিগর নেই। রাস্তার মোড়ে কেবল একটি ধুলোমাখা ভাঙা আয়না পড়ে আছে। সেই আয়নার এক কোণে ছোট করে লেখা—”মানুষ নিজেকে দেখতে পায় কেবল তখনই, যখন সে অন্যকে দেখতে শেখে।”
বৃদ্ধ ভাঙা আয়নাটি হাতে নিলেন। আয়নায় এখন তিনি নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছেন, যা আগে কখনো এতটা উজ্জ্বল মনে হয়নি। রাস্তার কোলাহল ছাপিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাঁকে গ্রাস করল। তিনি হাসলেন—কারিগরের মতোই শব্দহীন সেই হাসি।
রিপোর্টারের নাম 















