ঢাকা ০১:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

ওয়ান-ইলেভেনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাবির বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ ওসমানের সাহসী প্রতিবাদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি অবস্থার কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঝালকাঠিতে এক সাহসী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শহীদ ওসমান হাদী। দেশের সকল ধরনের মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাঁচটি নির্দিষ্ট বিভাগে (সম্ভবত আইন, ইংরেজি, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি এই ঝুঁকি গ্রহণ করেন।

শহীদ ওসমান হাদী একটি আলেম পরিবারে বেড়ে ওঠেন এবং তার পিতা তাকে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর ইচ্ছা পোষণ করতেন। পরিবারের এই ঐতিহ্য এবং তার বড় ভাই, যিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য আলেম, তাদের প্রতি মাদ্রাসার শিক্ষকদের গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তবে, ঢাকায় কোচিং করতে এসে তার চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামতে উদ্বুদ্ধ করে।

ঝালকাঠির মাদ্রাসায় তখন কঠোর শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার মধ্যে এমন পদক্ষেপ মাদ্রাসাকে গুরুতর বিপদে ফেলতে পারত। তাই ওসমান হাদী কোনো শিক্ষককে না জানিয়েই গোপনে তার বন্ধুদের নিয়ে প্রতিবাদের পরিকল্পনা করেন।

এক রাতের সিদ্ধান্তে তিনি বন্ধুদের সাথে ঝালকাঠি শহরে যান। রাত ১১টায় শহরের ‘বাদল আর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তিনি একটি বিশাল ব্যানার তৈরি করান। একইসাথে, হোস্টেলের আশেপাশে থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে প্ল্যাকার্ড তৈরি করা হয় এবং রাতভর গোপনে ব্যানার-ফেস্টুন প্রস্তুত করা হয়। এরপর তিনি মাদ্রাসার অন্যান্য ছাত্রদেরও এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করেন এবং তাদের সংগঠিত করেন। সিদ্ধান্ত হয়, বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক জলসা অনুষ্ঠানের পর ক্লাস ছুটি হলে মসজিদের সামনে থেকে মিছিল শুরু হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একবার মিছিল শুরু করতে পারলে আর কেউ তাদের আটকাতে পারবে না, এবং এর সকল দায়ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করবেন।

জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুবাদে ওসমান হাদী ঢাকার অনেক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সাথে পরিচিত ছিলেন। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ঝালকাঠি থেকে দিগন্ত টেলিভিশনের একজন সাংবাদিককে ফোন করে সংবাদ সংগ্রহের অনুরোধ জানান। জরুরি অবস্থার মধ্যে এমন একটি কর্মসূচির কথা শুনে সাংবাদিকরাও বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

পরদিন অপ্রত্যাশিতভাবে দিগন্ত টেলিভিশনসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা মাদ্রাসায় উপস্থিত হন, যা শিক্ষকদের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করে। শিক্ষকদের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওসমান হাদী প্রায় এক হাজার ছাত্রকে একত্রিত করেন। সামনে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে তারা শহর অভিমুখে মিছিল শুরু করেন। সফলভাবে মিছিলটি ডিসি অফিসে গিয়ে শেষ হয় এবং তারা সেখানে স্মারকলিপি জমা দেন। কর্মসূচি শেষে সবাই মাদ্রাসায় ফিরে গেলেও, শহীদ ওসমান হাদী সেদিন আর সরাসরি প্রতিষ্ঠানে ফেরেননি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

ফুলবাড়ীয়ায় অবৈধ জ্বালানি তেলসহ আটক ৩, লরি জব্দ

ওয়ান-ইলেভেনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাবির বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ ওসমানের সাহসী প্রতিবাদ

আপডেট সময় : ১১:৪৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি অবস্থার কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঝালকাঠিতে এক সাহসী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শহীদ ওসমান হাদী। দেশের সকল ধরনের মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাঁচটি নির্দিষ্ট বিভাগে (সম্ভবত আইন, ইংরেজি, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, সাংবাদিকতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি এই ঝুঁকি গ্রহণ করেন।

শহীদ ওসমান হাদী একটি আলেম পরিবারে বেড়ে ওঠেন এবং তার পিতা তাকে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর ইচ্ছা পোষণ করতেন। পরিবারের এই ঐতিহ্য এবং তার বড় ভাই, যিনি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য আলেম, তাদের প্রতি মাদ্রাসার শিক্ষকদের গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তবে, ঢাকায় কোচিং করতে এসে তার চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটে এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামতে উদ্বুদ্ধ করে।

ঝালকাঠির মাদ্রাসায় তখন কঠোর শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার মধ্যে এমন পদক্ষেপ মাদ্রাসাকে গুরুতর বিপদে ফেলতে পারত। তাই ওসমান হাদী কোনো শিক্ষককে না জানিয়েই গোপনে তার বন্ধুদের নিয়ে প্রতিবাদের পরিকল্পনা করেন।

এক রাতের সিদ্ধান্তে তিনি বন্ধুদের সাথে ঝালকাঠি শহরে যান। রাত ১১টায় শহরের ‘বাদল আর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে তিনি একটি বিশাল ব্যানার তৈরি করান। একইসাথে, হোস্টেলের আশেপাশে থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে প্ল্যাকার্ড তৈরি করা হয় এবং রাতভর গোপনে ব্যানার-ফেস্টুন প্রস্তুত করা হয়। এরপর তিনি মাদ্রাসার অন্যান্য ছাত্রদেরও এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করেন এবং তাদের সংগঠিত করেন। সিদ্ধান্ত হয়, বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক জলসা অনুষ্ঠানের পর ক্লাস ছুটি হলে মসজিদের সামনে থেকে মিছিল শুরু হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একবার মিছিল শুরু করতে পারলে আর কেউ তাদের আটকাতে পারবে না, এবং এর সকল দায়ভার তিনি নিজেই গ্রহণ করবেন।

জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুবাদে ওসমান হাদী ঢাকার অনেক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির সাথে পরিচিত ছিলেন। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ঝালকাঠি থেকে দিগন্ত টেলিভিশনের একজন সাংবাদিককে ফোন করে সংবাদ সংগ্রহের অনুরোধ জানান। জরুরি অবস্থার মধ্যে এমন একটি কর্মসূচির কথা শুনে সাংবাদিকরাও বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

পরদিন অপ্রত্যাশিতভাবে দিগন্ত টেলিভিশনসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা মাদ্রাসায় উপস্থিত হন, যা শিক্ষকদের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করে। শিক্ষকদের কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওসমান হাদী প্রায় এক হাজার ছাত্রকে একত্রিত করেন। সামনে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে তারা শহর অভিমুখে মিছিল শুরু করেন। সফলভাবে মিছিলটি ডিসি অফিসে গিয়ে শেষ হয় এবং তারা সেখানে স্মারকলিপি জমা দেন। কর্মসূচি শেষে সবাই মাদ্রাসায় ফিরে গেলেও, শহীদ ওসমান হাদী সেদিন আর সরাসরি প্রতিষ্ঠানে ফেরেননি।