ঢাকা ০১:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

আল্লামা ইকবালের দূরদৃষ্টি: এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল প্রথমবারের মতো উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে একত্রিত করে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তুলে ধরেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভাষণই অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের জন্য আত্মমর্যাদা ও স্বশাসনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

এই ঐতিহাসিক ভাষণে ইকবাল উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত এই রাষ্ট্রে মুসলমানেরা নিজস্ব জাতিসত্তা, মূল্যবোধ ও আদর্শ অনুসারে পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে। এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি জাতির আত্মপ্রকাশের প্রথম সুস্পষ্ট ঘোষণা।

এর কিছুদিন পরেই, ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আজাদ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তাঁকে কেউ জীবিত ধরতে পারবে না, এবং তাঁর এই মৃত্যু ব্রিটিশ শাসকের ভিত নাড়িয়ে দেয়। একই বছর লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয় ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর মতো বীর বিপ্লবীদের। মাতৃভূমির এই বীর সন্তানদের আত্মত্যাগে মর্মাহত আল্লামা ইকবাল দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে বিলাত যান। সেখানেই তিনি এক ভিন্ন অনুপ্রেরণার খোঁজে পাড়ি জমান ইবেরীয় উপদ্বীপের আন্দালুসিয়ায়।

কর্ডোবার খিলাফতের রাজধানী মাদীনাতুজ জাহরার ধ্বংসস্তূপের মাঝে তিনি একাকী হেঁটেছিলেন। এক সূর্যাস্তের সময় কর্ডোবার বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল-মসজিদের সামনে তাঁর মনে এক অপূর্ব উপলব্ধির মতো উদয় হয় ‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতাটি। পরবর্তীতে তিনি এটি তাঁর ‘বাল-এ-জিবরিল’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন।

আল্লামা ইকবালের আন্দালুসিয়া ভ্রমণের পেছনে কোনো সাধারণ পর্যটকের কৌতূহল ছিল না, বরং তাঁকে টেনে এনেছিল এক গভীর অন্তর্নিহিত বেদনা এবং এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসা। তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, মুসলিম ইতিহাসের পতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলমান কীভাবে নিজের ভবিষ্যতের মানচিত্র তৈরি করতে পারে। সেই সময়ে ইউরোপে মুসলিম ক্ষমতার রাজনৈতিক স্মৃতি প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং উপমহাদেশে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাসও ছিল টালমাটাল। এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ইকবালের এই আত্মানুসন্ধান ছিল এক জাতির পুনরুত্থানের দিশা খোঁজার এক গভীর প্রয়াস।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

ফুলবাড়ীয়ায় অবৈধ জ্বালানি তেলসহ আটক ৩, লরি জব্দ

আল্লামা ইকবালের দূরদৃষ্টি: এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আপডেট সময় : ১১:৪৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল প্রথমবারের মতো উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে একত্রিত করে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তুলে ধরেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভাষণই অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের জন্য আত্মমর্যাদা ও স্বশাসনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

এই ঐতিহাসিক ভাষণে ইকবাল উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত এই রাষ্ট্রে মুসলমানেরা নিজস্ব জাতিসত্তা, মূল্যবোধ ও আদর্শ অনুসারে পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে। এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ একটি জাতির আত্মপ্রকাশের প্রথম সুস্পষ্ট ঘোষণা।

এর কিছুদিন পরেই, ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদ ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আজাদ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তাঁকে কেউ জীবিত ধরতে পারবে না, এবং তাঁর এই মৃত্যু ব্রিটিশ শাসকের ভিত নাড়িয়ে দেয়। একই বছর লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি হয় ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুর মতো বীর বিপ্লবীদের। মাতৃভূমির এই বীর সন্তানদের আত্মত্যাগে মর্মাহত আল্লামা ইকবাল দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে বিলাত যান। সেখানেই তিনি এক ভিন্ন অনুপ্রেরণার খোঁজে পাড়ি জমান ইবেরীয় উপদ্বীপের আন্দালুসিয়ায়।

কর্ডোবার খিলাফতের রাজধানী মাদীনাতুজ জাহরার ধ্বংসস্তূপের মাঝে তিনি একাকী হেঁটেছিলেন। এক সূর্যাস্তের সময় কর্ডোবার বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল-মসজিদের সামনে তাঁর মনে এক অপূর্ব উপলব্ধির মতো উদয় হয় ‘মসজিদে কুরতুবা’ কবিতাটি। পরবর্তীতে তিনি এটি তাঁর ‘বাল-এ-জিবরিল’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন।

আল্লামা ইকবালের আন্দালুসিয়া ভ্রমণের পেছনে কোনো সাধারণ পর্যটকের কৌতূহল ছিল না, বরং তাঁকে টেনে এনেছিল এক গভীর অন্তর্নিহিত বেদনা এবং এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসা। তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন, মুসলিম ইতিহাসের পতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলমান কীভাবে নিজের ভবিষ্যতের মানচিত্র তৈরি করতে পারে। সেই সময়ে ইউরোপে মুসলিম ক্ষমতার রাজনৈতিক স্মৃতি প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং উপমহাদেশে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাসও ছিল টালমাটাল। এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে ইকবালের এই আত্মানুসন্ধান ছিল এক জাতির পুনরুত্থানের দিশা খোঁজার এক গভীর প্রয়াস।