দেশজুড়ে এলপিজি গ্যাসের সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল মিলছে না। নির্ধারিত ১ হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা গুনতে হলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং বেসরকারি খাতের একক নিয়ন্ত্রণ বা সিন্ডিকেট ভাঙতে এবার সরকারিভাবে বড় ধরনের বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
এলপিজির খুচরা বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে পরিবহন খাত পর্যন্ত স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ শুরু হয়েছে।
সারাদেশে এলপিজি গ্যাসের যে হাহাকার চলছে, তা কাটাতে সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দিকে হাঁটছে। জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৭ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে থাকায় তারা কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এই একক আধিপত্য বা সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপন অথবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বড় বিনিয়োগের পথে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সরকারি এলপিজি রিফিল স্টেশনের ক্ষমতা প্রতি মাসে এক লাখ টনের বেশি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৪০ হাজার টনেরও বেশি। এবারের তীব্র শীত এবং তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনে সরবরাহের ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। রাজধানীর গণভবনের সামনে তিতাসের ভাল্ব মেরামতের কারণে সাময়িক সমস্যা হলেও মূল সংকট দাঁড়িয়েছে এলএনজি আমদানির স্বল্পতা। তিতাস সিস্টেমে দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় মানুষ বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখছে আকাশচুম্বী দাম। ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, আগে বাড়তি টাকা দিলেও গ্যাস পাওয়া যেত, কিন্তু এখন চড়া দামেও সিলিন্ডার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দিচ্ছেন বেসরকারি অপারেটররা। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে চাহিদার কারণে ভিন্ন উৎস থেকে এলপিজি আনতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে। তবে আশার কথা হলো, আগামী সপ্তাহ থেকে বড় বড় এলপিজি কার্গো জাহাজ দেশে পৌঁছাতে শুরু করবে। মেঘনা এলপিজিসহ বড় কয়েকটি কোম্পানি জানিয়েছে, ১০ হাজার টনের জাহাজ বন্দরে ভিড়লে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তবে সামনে রমজান মাস থাকায় বর্ধিত চাহিদা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক উদ্বেগ রয়ে গেছে।
পরিবহন খাতের বিপর্যয় নিয়ে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, চলমান সংকটে যাত্রীসেবা ও জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে। এলপিজি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশ লেবার পার্টির এক মানববন্ধনে বলা হয়, সরকারি দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে গ্যাস বিক্রি করা একটি সংগঠিত লুটপাট ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাজধানীর বাইরে বরিশালেও সিলিন্ডার প্রতি অন্তত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দাম বেড়েছে। অসাধু খুচরা ব্যবসায়ীরা সংকটের সুযোগ নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের পকেট কাটছে। তিতাসের রাইরবাগ জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্যাস সংকট এখন একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ব্যবধান না ঘুচলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দাবি, বাজার মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক।
রিপোর্টারের নাম 

























