ঢাকা ১০:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: নেপাল-ইন্দোনেশিয়া এগোলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক বৈঠক ও সফরের পরও শ্রমবাজারটি খোলার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। যখন ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল মালয়েশিয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক পাঠিয়ে বাজার দখল করে নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ থেকে এক বছরে মাত্র ২৯০ জন শ্রমিক যেতে পেরেছেন। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, ঢালাও মামলা এবং অর্থ পাচারের অপ্রমাণিত অভিযোগের কারণেই মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। এর ফলে নতুন করে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য অন্যতম নির্ভরযোগ্য গন্তব্য মালয়েশিয়া এখন অন্য দেশগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত জিটুজি প্লাস চুক্তিতে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক পাঠানো হলেও বর্তমানে সেই প্রবাহ পুরোপুরি স্থবির।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়া ২৯,৯০০ এবং নেপাল ২১,১৮৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের জন্য নেপাল ৬০ হাজার এবং ইন্দোনেশিয়া ২২ হাজার শ্রমিকের নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ১,৮৫৩ জন। গত মে মাসের পর থেকে অন্যান্য উৎস দেশগুলো নিয়মিত শ্রমিক পাঠালেও বাংলাদেশ থেকে মাসে ১০০ জন শ্রমিকও যেতে পারছেন না।

২০২৪ সালের মে মাসে আটকে পড়া প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিকের মালয়েশিয়া পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বোয়েসেলকে (BOESL)। কিন্তু ছয় মাসে তারা মাত্র ১৫০ জন শ্রমিক পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিআইডি ও দুদকের করা ‘মানি লন্ডারিং’ ও ‘মানব পাচার’ মামলার কারণে মালয়েশিয়া সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের মতে, এসব মামলার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মানব পাচার সূচক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগ প্রত্যাহার বা সঠিক তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা বাংলাদেশ থেকে বড় পরিসরে শ্রমিক নিতে আগ্রহী নয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ের সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা করা হচ্ছে। তবে সরকারের এই ‘সিদ্ধান্তহীনতা’ এবং নতুন এজেন্সি নির্বাচনের ধীরগতিতে পুরো প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে। বায়রা নেতাদের অভিযোগ, ঢালাও মামলার কারণে বিদেশি নিয়োগকর্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। গবেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি স্থায়ীভাবে নেপাল বা ইন্দোনেশিয়ার দখলে চলে যেতে পারে।

৫টি প্রধান কারণ যা শ্রমবাজারকে বাধাগ্রস্ত করছে:

১. আইনি জটিলতা: রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিআইডি ও দুদকের করা অমীমাংসিত মামলা।
২. বোয়েসেলের ধীরগতি: সরকারি সংস্থার মাধ্যমে শ্রমিক পাঠাতে আশানুরূপ সফলতার অভাব।
৩. প্রতিযোগিতা: নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত বাজার দখল ও আগ্রাসী কৌশল।
৪. সিদ্ধান্তহীনতা: নতুন রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতা।
৫. আস্থার সংকট: অভিবাসন ব্যয় ও অর্থ পাচার নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের নেতিবাচক মনোভাব।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শচীনকে ছাড়িয়ে কোহলির বিশ্বরেকর্ড, কিউইদের হারিয়ে শুভসূচনা ভারতের

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: নেপাল-ইন্দোনেশিয়া এগোলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০২:০৭:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক বৈঠক ও সফরের পরও শ্রমবাজারটি খোলার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। যখন ইন্দোনেশিয়া ও নেপাল মালয়েশিয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক পাঠিয়ে বাজার দখল করে নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ থেকে এক বছরে মাত্র ২৯০ জন শ্রমিক যেতে পেরেছেন। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, ঢালাও মামলা এবং অর্থ পাচারের অপ্রমাণিত অভিযোগের কারণেই মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। এর ফলে নতুন করে প্রায় ৫ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য অন্যতম নির্ভরযোগ্য গন্তব্য মালয়েশিয়া এখন অন্য দেশগুলোর দখলে চলে যাচ্ছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত জিটুজি প্লাস চুক্তিতে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক পাঠানো হলেও বর্তমানে সেই প্রবাহ পুরোপুরি স্থবির।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়া ২৯,৯০০ এবং নেপাল ২১,১৮৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের জন্য নেপাল ৬০ হাজার এবং ইন্দোনেশিয়া ২২ হাজার শ্রমিকের নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ১,৮৫৩ জন। গত মে মাসের পর থেকে অন্যান্য উৎস দেশগুলো নিয়মিত শ্রমিক পাঠালেও বাংলাদেশ থেকে মাসে ১০০ জন শ্রমিকও যেতে পারছেন না।

২০২৪ সালের মে মাসে আটকে পড়া প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিকের মালয়েশিয়া পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা বোয়েসেলকে (BOESL)। কিন্তু ছয় মাসে তারা মাত্র ১৫০ জন শ্রমিক পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিআইডি ও দুদকের করা ‘মানি লন্ডারিং’ ও ‘মানব পাচার’ মামলার কারণে মালয়েশিয়া সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের মতে, এসব মামলার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মানব পাচার সূচক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগ প্রত্যাহার বা সঠিক তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা বাংলাদেশ থেকে বড় পরিসরে শ্রমিক নিতে আগ্রহী নয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সময়ের সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা করা হচ্ছে। তবে সরকারের এই ‘সিদ্ধান্তহীনতা’ এবং নতুন এজেন্সি নির্বাচনের ধীরগতিতে পুরো প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে। বায়রা নেতাদের অভিযোগ, ঢালাও মামলার কারণে বিদেশি নিয়োগকর্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। গবেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি স্থায়ীভাবে নেপাল বা ইন্দোনেশিয়ার দখলে চলে যেতে পারে।

৫টি প্রধান কারণ যা শ্রমবাজারকে বাধাগ্রস্ত করছে:

১. আইনি জটিলতা: রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সিআইডি ও দুদকের করা অমীমাংসিত মামলা।
২. বোয়েসেলের ধীরগতি: সরকারি সংস্থার মাধ্যমে শ্রমিক পাঠাতে আশানুরূপ সফলতার অভাব।
৩. প্রতিযোগিতা: নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত বাজার দখল ও আগ্রাসী কৌশল।
৪. সিদ্ধান্তহীনতা: নতুন রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতা।
৫. আস্থার সংকট: অভিবাসন ব্যয় ও অর্থ পাচার নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের নেতিবাচক মনোভাব।