ইউরোপের বিলাসবহুল সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু করে প্যারিস কিংবা লন্ডনের ফ্যাশন রাজধানী—গ্রীষ্মের আগমনীতে ফ্যাশন সচেতনদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে প্রাকৃতিক আঁশে তৈরি নান্দনিক ব্যাগ। মাটির রঙের, ঝুড়ি বা ক্রোশে নকশার এই অনুষঙ্গগুলোকে বলা হয় ‘রাফিয়া ব্যাগ’। ১৯৬০-এর দশকে ব্রিজিত বার্দো ও জ্যাকলিন কেনেডির মতো ফ্যাশন আইকনদের হাত ধরে জনপ্রিয় হওয়া এসব ব্যাগ আজ প্রাডা, সেন্ট লরেন্ট কিংবা ফেঁদির মতো বিশ্বখ্যাত লাক্সারি ব্র্যান্ডের বহুমূল্যের ফ্ল্যাগশিপ আইটেমে পরিণত হয়েছে।
তবে বিশ্বজুড়ে অতিপরিচিত এই ব্যাগের মূল উপাদান কোথা থেকে আসে, তা অনেকেরই অজানা। বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত মোট রাফিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কার। পরিবেশবান্ধব ও বিলাসবহুল উপাদান হিসেবে রাফিয়ার কদর বাড়লেও, এর পেছনে থাকা মাদাগাস্কারের প্রাচীন ইতিহাস ও স্থানীয় কারিগরদের অবদান আন্তর্জাতিক প্রচারের আড়ালেই থেকে গেছে।
মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর ডিজাইনার দোমি সানজি জানান, রাফিয়া কেবল একটি কাঁচামাল নয়, বরং এটি মালাগাসি অর্থাৎ মাদাগাস্কার অধিবাসীদের জীবনের সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশের সংবিধানে উল্লেখিত জাতীয় দর্শন ‘ফিহাভানানা’ মূলত ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক মেলবন্ধন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কথা বলে। দোমি সানজির মতে, রাফিয়া আঁশগুলোকে যেভাবে বুনে মজবুত রূপ দেওয়া হয়, তা মালাগাসি সংস্কৃতির পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেতনাকেই ফুটিয়ে তোলে।
প্রাকৃতিক এই রাফিয়া মূলত মাদাগাস্কারের বিশাল আকৃতির রাফিয়া পামগাছের পাতা থেকে সংগৃহীত হয়। পাতা ছেঁড়ার পর ভেতরের নরম অংশ ছাড়িয়ে রোদে শুকিয়ে তামাটে রঙে রূপ দেওয়া হয়। এরপর দক্ষ কারিগরেরা দিনের পর দিন হাজার হাজার সেলাইয়ের মাধ্যমে নিখুঁত হাতে গড়ে তোলেন নানা ধরণের ব্যাগ ও টুপি।
তবে বিশ্ববাজারে চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় কারিগরদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অনিয়ন্ত্রিত সাপ্লাই চেইন স্থানীয় কারিগরদের সস্তা শ্রমে বাধ্য করছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত কাঁচামাল সংগ্রহের কারণে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশটির পূর্ব উপকূলে প্রায় ৪৮.৫ লাখ হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বৈষম্য ও পরিবেশগত শোষণের বিরুদ্ধে কাজ করছেন ইতালিয়ান-ইন্ডিয়ান উদ্যোক্তা এলেন আকবারালি। ২০১৯ সালে তিনি চালু করেন ‘মেড ফর আ উইমেন’ নামের একটি সামাজিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় এক হাজার কর্মীর ৯০ শতাংশের বেশি নারী, যারা পারিবারিক নির্যাতন বা সামাজিক অবহেলার শিকার।


























