রানওয়ে, হ্যাঙ্গার গেট, অ্যাপ্রন, ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে কাস্টমসের গ্রিন চ্যানেল—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল পয়েন্টে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ও এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তিসম্পন্ন ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা। রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গোল্ড ডিটেক্টর ও স্ক্যানার। এর সঙ্গে অর্ধশতাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালালেও থামছে না স্বর্ণ চোরাচালানের স্রোত। প্রায় নিয়মিতই একের পর এক বড় চালান ধরা পড়লেও নেপথ্যের রাঘববোয়াল বা মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সবশেষ গত ২৮ অক্টোবর ঢাকার কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম চীন থেকে আসা দুই যাত্রীর শরীর থেকে পেস্ট আকারে লুকানো ১২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা। এর আগে ৪ অক্টোবর রানওয়েতে বিমানের দুই কর্মীর জুতার ভেতর থেকে ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ৮০টি স্বর্ণের বার (৯ দশমিক ৩৪ কেজি) জব্দ করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিমানবন্দরে ২৬ কেজি এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৮৭ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছিল। আর চলতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ পার করতে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রগুলো ‘কাটআউট’ ও ‘কোড’ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইকে মূল ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আসা যাত্রীদের টাকার লোভে বাহক বানানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাহক নিজেও জানে না স্বর্ণের প্রকৃত মালিক কে বা কার কাছে তা হস্তান্তর করা হবে। শুধু একটি নির্দিষ্ট সিক্রেট কোড মুখস্থ করিয়ে দেওয়া হয়, যা বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ রিসিভারকে বলে স্বর্ণ বুঝিয়ে দিতে হয়। ফলে বাহক বা বিমানকর্মীরা হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতাদের কোনো সূত্র তদন্তকারীদের হাতে আসে না।
পাচারের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত পাল্টানো হচ্ছে কৌশল। যাত্রীর শরীর ছাড়াও জুতা, কলার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ট্রলির হাতল, ফলের ক্যারেট কিংবা ফ্লাইটের টয়লেট প্যানেল ও কার্গো হোলে স্বর্ণ লুকিয়ে আনা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির কারণেই বড় বড় চালান আটক সম্ভব হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের বাহক বা কিছু অসাধু বিমানকর্মীকে গ্রেপ্তার করে এই চোরাচালান বন্ধ করা যাবে না। পুরো সিন্ডিকেট ও মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি কার্গো ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত দায়িত্বশীল কর্মীদের নিয়মিত বদলি ও সমন্বিত তদন্তই পারে শাহজালাল বিমানবন্দরকে চোরাচালানমুক্ত করতে।





















