দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে রয়েছে বিপজ্জনক রাসায়নিক পণ্যবাহী ৩১৮টি কনটেইনার। দিনের পর দিন অবহেলায় পড়ে থাকায় এর মধ্যে বহু কনটেইনার ইতিমধ্যে চরম জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব কনটেইনারে থাকা দাহ্য ও বিস্ফোরক রাসায়নিকের কারণে পুরো বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের দৈনন্দিন স্বাভাবিক পরিচালন কার্যক্রম। বিপজ্জনক এসব কনটেইনার দ্রুত সরিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় চিঠি দিলেও দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় তা আটকে ছিল। তবে সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কনটেইনারগুলো অপসারণ ও ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের মজুদে ঘটা প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। সেই রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি বিশ্বের সমুদ্রবন্দরগুলোতে বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছিল। চট্টগ্রাম বন্দরেও এর আগে ২০১৫ সালে রাসায়নিক বিস্ফোরণে চার শ্রমিক মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে একটি ব্যাটারিবাহী কনটেইনারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই বছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডবাহী কনটেইনারে বিস্ফোরণ ও আগুনে ৫০ জনের তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও দেশের প্রধান বন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিকের এমন অনিষ্পন্ন স্তূপ বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পণ্য আমদানি করা হয়, যার মধ্যে অতিমাত্রার দাহ্য ও বিস্ফোরক পদার্থও অন্তর্ভুক্ত থাকে। আমদানিকারকদের আইনি জটিলতা, মামলা ও কাগজপত্র সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে বিপজ্জনক এসব পণ্যের খালাস আটকে যায় এবং মাসের পর মাস বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডেই তা পড়ে থাকে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য এমন ৩১৮টি বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু কাস্টমসের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত নিলাম বা ধ্বংসের ব্যবস্থা না করায় কনটেইনারগুলো এখনো বন্দরের অভ্যন্তরেই মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে এমনিতেই ধারণক্ষমতার চেয়ে জায়গার সংকট বেশি। তার ওপর বিপজ্জনক ও বিষাক্ত দাহ্য পদার্থবাহী শত শত কনটেইনার দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে রেখেছে। দ্রুত এগুলো না সরালে যেকোনো মুহূর্তে সীতাকুণ্ড বা বৈরুতের মতো বিপর্যয় ঘটতে পারে, যা পুরো বন্দরকে অচল করে দেবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনার কাস্টমসকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে এগুলো নিলাম ও ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কনটেইনারগুলো বন্দর থেকে স্থায়ীভাবে সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালার প্রযোজ্য বিধিমালা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই বিপজ্জনক রাসায়নিক কনটেইনারগুলো নিলাম অথবা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ধ্বংসের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হবে।

























