মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৫:৪৩ অপরাহ্ন | ২৬শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার, ১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

স্মার্টফোনের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ: বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ

  • হালনাগাদ সময় : ০১:৫২:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

বর্তমান যুগে ছোটদের বর্ণিল ও উচ্ছল শৈশব যেন পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চির একটি ডিজিটাল পর্দার মাঝে পুরোপুরি আটকা পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সন্তানদের শান্ত রাখার কৌশল হিসেবে অথবা অতিরিক্ত স্নেহের বশবর্তী হয়ে তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এই সামান্য অবহেলা বা আদর যে শিশুদের জন্য কতটা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট। আজকাল সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই সাইবার জগতের ফাঁদ কিংবা মোবাইল গেমের জেরে শিশু-কিশোরদের অপহরণ ও হত্যার মতো লোমহর্ষক খবর প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে।

‘পাবজি’ কিংবা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গেমগুলোর ভার্চুয়াল দুনিয়ার যুদ্ধ এখন আর কেবল অনলাইনেই আটকে নেই; বরং তা বাস্তব জীবনেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। পুলিশের দেওয়া অপরাধ বিষয়ক পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো স্মার্টফোন আসক্তি। গেমের আইডি কেনাবেচা এবং ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের মধ্যে মারাত্মক মারামারি ও হানাহানির ঘটনা ঘটছে। যে আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ ও গতিশীল করার কথা ছিল, আমাদের সামান্য অসতর্কতার সুযোগে তা আজ কোমলমতি সন্তানদের প্রাণনাশের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আদর করে দেওয়া এই জাদুকরী যন্ত্রটি তাই কেবল তাদের সোনালি শৈশবই কেড়ে নিচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন প্রদীপও চিরতরে নিভিয়ে দিচ্ছে।

স্মার্টফোনের এই আসক্তি কেবল শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি তাদের মনোজগতেও প্রতিনিয়ত এক ভয়াবহ ও নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, অতিরিক্ত সময় ধরে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর স্বাভাবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ করে থাকে। মোবাইলের স্ক্রিনে খুব দ্রুত পরিবর্তন হওয়া রঙিন দৃশ্যপট এবং ছোট ছোট ভিডিওগুলো শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে কৃত্রিম উপায়ে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। এর ফলে শিশুরা অনেকটা মাদকের মতোই এই যন্ত্রটির প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের আসক্তির কারণে শিশুদের কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা কথায় কথায় রেগে যাওয়ার মতো খিটখিটে স্বভাবের অধিকারী হয়ে ওঠে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন টাইম সম্পূর্ণ শূন্য বা একদম সীমিত পর্যায়ে রাখতে হবে। কারণ মানবজীবনের এই সময়টাতেই মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, আধুনিকতা ও ডিজিটাল যুগের দোহাই দিয়ে আমরা অবুঝ শিশুদের হাতে এমন একটি আসক্তির বস্তু তুলে দিচ্ছি, যা তাদের অন্তর্নিহিত মেধা ও সৃজনশীলতাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাছাড়া ইন্টারনেটের এই বিশাল ও সীমাহীন জগৎ একটি অপূর্ণাঙ্গ বা অপরিণত শিশুর জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক অন্ধকার ও বিপজ্জনক গহীন অরণ্যের মতো। সাইবার জগতে এমন অসংখ্য ক্ষতিকর কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু ছড়িয়ে আছে, যেগুলো কোনোভাবেই শিশুদের মানসিক বিকাশের উপযোগী নয়; অথচ সেগুলো এখন খুব সহজেই তাদের হাতের নাগালে চলে এসেছে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ

26 October 2026

সরকারের সবুজ সংকেত পেলে মাদকমুক্তিতে 'ক্রসফায়ারেও' পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

স্মার্টফোনের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ: বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ

হালনাগাদ সময় : ০১:৫২:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বর্তমান যুগে ছোটদের বর্ণিল ও উচ্ছল শৈশব যেন পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চির একটি ডিজিটাল পর্দার মাঝে পুরোপুরি আটকা পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সন্তানদের শান্ত রাখার কৌশল হিসেবে অথবা অতিরিক্ত স্নেহের বশবর্তী হয়ে তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এই সামান্য অবহেলা বা আদর যে শিশুদের জন্য কতটা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট। আজকাল সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই সাইবার জগতের ফাঁদ কিংবা মোবাইল গেমের জেরে শিশু-কিশোরদের অপহরণ ও হত্যার মতো লোমহর্ষক খবর প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে।

‘পাবজি’ কিংবা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গেমগুলোর ভার্চুয়াল দুনিয়ার যুদ্ধ এখন আর কেবল অনলাইনেই আটকে নেই; বরং তা বাস্তব জীবনেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে। পুলিশের দেওয়া অপরাধ বিষয়ক পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো স্মার্টফোন আসক্তি। গেমের আইডি কেনাবেচা এবং ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের মধ্যে মারাত্মক মারামারি ও হানাহানির ঘটনা ঘটছে। যে আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ ও গতিশীল করার কথা ছিল, আমাদের সামান্য অসতর্কতার সুযোগে তা আজ কোমলমতি সন্তানদের প্রাণনাশের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আদর করে দেওয়া এই জাদুকরী যন্ত্রটি তাই কেবল তাদের সোনালি শৈশবই কেড়ে নিচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন প্রদীপও চিরতরে নিভিয়ে দিচ্ছে।

স্মার্টফোনের এই আসক্তি কেবল শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি তাদের মনোজগতেও প্রতিনিয়ত এক ভয়াবহ ও নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, অতিরিক্ত সময় ধরে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর স্বাভাবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ করে থাকে। মোবাইলের স্ক্রিনে খুব দ্রুত পরিবর্তন হওয়া রঙিন দৃশ্যপট এবং ছোট ছোট ভিডিওগুলো শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে কৃত্রিম উপায়ে ‘ডোপামিন’ নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়। এর ফলে শিশুরা অনেকটা মাদকের মতোই এই যন্ত্রটির প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের আসক্তির কারণে শিশুদের কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা কথায় কথায় রেগে যাওয়ার মতো খিটখিটে স্বভাবের অধিকারী হয়ে ওঠে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন টাইম সম্পূর্ণ শূন্য বা একদম সীমিত পর্যায়ে রাখতে হবে। কারণ মানবজীবনের এই সময়টাতেই মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, আধুনিকতা ও ডিজিটাল যুগের দোহাই দিয়ে আমরা অবুঝ শিশুদের হাতে এমন একটি আসক্তির বস্তু তুলে দিচ্ছি, যা তাদের অন্তর্নিহিত মেধা ও সৃজনশীলতাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাছাড়া ইন্টারনেটের এই বিশাল ও সীমাহীন জগৎ একটি অপূর্ণাঙ্গ বা অপরিণত শিশুর জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক অন্ধকার ও বিপজ্জনক গহীন অরণ্যের মতো। সাইবার জগতে এমন অসংখ্য ক্ষতিকর কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু ছড়িয়ে আছে, যেগুলো কোনোভাবেই শিশুদের মানসিক বিকাশের উপযোগী নয়; অথচ সেগুলো এখন খুব সহজেই তাদের হাতের নাগালে চলে এসেছে।

Share this news as a Photo Card