মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৩:১৫ অপরাহ্ন | ২৭শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার, ১১ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

সংবিধানে রয়েছে বিশেষ সুরক্ষার সুযোগ: সমতলের আদিবাসীদের জন্য সংবেদনশীল ব্যবস্থার তাগিদ

  • হালনাগাদ সময় : ১০:০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার ও সংকট নিয়ে জাতীয় পরিসরে নিয়মিত আলোচনা হলেও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো অনেকটাই প্রচারের আড়ালে রয়ে গেছে। পৈতৃক জমি জবরদখল, মজুরি বৈষম্য, নারী নির্যাতন এবং উচ্ছেদের মতো বহুমুখী অপরাধের তারা নিয়মিত শিকার হলেও প্রতিকার পাওয়ার আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা অত্যন্ত সীমিত। মাঠপর্যায়ের নানা পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে এমন বঞ্চনাময় চিত্রই ফুটে উঠেছে।

উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও এবং মাহাতো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়—থানায় কীভাবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে হয়, সরকারি বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কীভাবে পেতে হয় কিংবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদনের নিয়মাবলি কী—এসব বিষয়ে তাদের সিংহভাগের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার এক সাঁওতাল কৃষকের কথায় তাদের অসহায়ত্বের স্বরূপ স্পষ্ট হয়। তিনি জানান, কোনো মারামারি বা বিবাদ ঘটলে তারা স্থানীয় মাতব্বরের শরণাপন্ন হন। থানা বা পুলিশ তাদের কাছে অনেক দূরের এবং ভীতিকর বিষয় মনে হয়; আইনি ব্যবস্থার জন্য কী কাগজপত্র প্রয়োজন হয় বা কোথায় যেতে হয়, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

আদিবাসীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রধান বাধাগুলো

বসতভিটা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ কিংবা সহিংসতার শিকার হলে একজন সাধারণ আদিবাসী নাগরিক কোথায় আশ্রয় খুঁজবেন? নিয়ম অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে যেতে হয় নিকটস্থ থানায়। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়, সংকোচ এবং পুনরায় বঞ্চনার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই মূলত আদিবাসীদের মধ্যে থানায় যাওয়ার প্রবল অনীহা কাজ করে। অনেকের মনে এমন পূর্বধারণা বদ্ধমূল যে, তাদের কথা বা অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে না শুনেই একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিয়মিত নথিভুক্ত পরিসংখ্যান থাকলেও সমতলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পৃথক তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষিত নেই।

২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে তিন সাঁওতাল হত্যাকাণ্ডের ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও আজও সেই নির্মমতার বিচার নিশ্চিত হয়নি। অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই দীর্ঘস্থায়ী বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত অপরাধীদের বারবার উৎসাহিত করছে। এমনকি চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদাফার্ম এলাকায় পৈতৃক জমি ফেরত ও তিন সাঁওতাল হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশেও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমোন বাস্কে দৃঢ়তার সাথে জানান, ২০১৬ সালের সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং বাপ-দাদার জমি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

অভিযোগ দায়েরের আগেই সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা

অতীতের নানা তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যুগ যুগ ধরে এই জনপদে আদিবাসীদের ওপর নানা অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের বিচার পাওয়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী পল্লীর বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে বহুমুখী কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—অভিযোগ জানানোর আগেই পরিবারের অভ্যন্তরীণ বাধা, স্থানীয় সামাজিক আধিপত্যের কারণে নীরব থাকতে বাধ্য হওয়া এবং থানায় আদিবাসীবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থার চরম অনুপস্থিতি।

সমতলের একটি সাধারণ আদিবাসী পাড়ায় সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি প্রান্তিক পরিবার বসবাস করে, যার চারপাশ ঘেরা থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর গ্রাম দিয়ে। ফলে কোনো আদিবাসী নারী বাইরের কারও দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলে প্রথম বাধাটি আসে তাদের নিজেদের সমাজ থেকেই।

নওগাঁর এক আদিবাসী নারী জানান, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার প্রথম আঘাত এসে পড়ে পুরো পাড়ার ওপর। আইনি পদক্ষেপ বা অভিযোগ জানাতে গেলে গোটা পাড়ায় হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়, জমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি আসে, এমনকি স্থানীয় ইটভাটায় তাদের দিনমজুরির কাজও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে পাড়ার মাতব্বর বা পরিবারের প্রবীণরা বলেন—‘মুখ বন্ধ রাখো, তবেই পুরো গ্রাম রক্ষা পাবে।’

এর ফলে বহু গুরুতর ফৌজদারি অপরাধও থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় না; বরং স্থানীয় সালিশেই নামমাত্র মীমাংসা করে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সেখানে ভুক্তভোগী নারী হলেও তার নিজস্ব কোনো মতামত বা ক্ষোভের গুরুত্ব থাকে না। স্থানীয়দের মতে, এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক স্থায়ী সামাজিক অচলাবস্থা। আদিবাসী অধিকারকর্মী পপি রানী ভূমিজ সিং আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নির্যাতনের ঘটনায় প্রকৃত বিচার পাওয়ার নজির সমতলে নেই বললেই চলে।

থানায় যেতে অনীহা ও ভাষাগত দূরত্ব

থানা এড়িয়ে চলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্থানীয় এক নারী জানান, তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন না। অথচ থানায় তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা বুঝতে পারার মতো কোনো লোক থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামের কোনো পুরুষকে সাথে নিয়ে যেতে হয়। এর সাথে যুক্ত হয় পুলিশের প্রতি একধরনের দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক ভয়।

এছাড়া শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মেডিকেল পরীক্ষা করানো তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই পথ পাড়ি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত যাতায়াত ভাড়া কিংবা সাথে যাওয়ার মতো কোনো পুরুষ অভিভাবক অনেক পরিবারের থাকে না। তাছাড়া হাসপাতালে পৌঁছে কার কাছে যেতে হবে, কীভাবে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে—সে সম্পর্কেও তাদের স্বচ্ছ জ্ঞান থাকে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কেউ যদি অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে চান, তবে তার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে। কোনো অভিযোগকারী ভিন্ন ভাষার হলে স্থানীয় দোভাষীর সহায়তায় অভিযোগ নথিবদ্ধ বা এজাহারভুক্ত করা হয়। মামলা রেকর্ডের আগে সেই দোভাষীর মাধ্যমে পুরো এজাহারটি অভিযোগকারীকে পড়ে শোনানো হয় এবং এরপরই আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু করা হয়ে থাকে।

আদালতে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ধকল

দেশে একটি নারী নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। একজন দিনমজুর আদিবাসী নারীর পক্ষে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়া চরম কষ্টসাধ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতি শুনানিতে আইনজীবীর চড়া ফি এবং দীর্ঘ পথের যাতায়াত ব্যয়।

সরকারি লিগ্যাল এইড ব্যবস্থা চালু থাকলেও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোতে আদিবাসী নারীদের সহায়তার জন্য কোনো স্বতন্ত্র বা বিশেষায়িত ডেস্ক নেই। তাছাড়া আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনি জটিল ভাষা এবং বাংলায় দ্রুত জেরা করার কারণে অনেক আদিবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়েন; কারণ কাঠগড়ায় তাদের জন্য কোনো অনুবাদকের ব্যবস্থা থাকে না। উপরন্তু মামলা করার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের হুমকিতে নিরাপত্তা হারিয়ে অনেক ভুক্তভোগীকে শেষ পর্যন্ত নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়।

ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সার্বিক সংকট নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, দেশে সাধারণ মানুষের জন্যই ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে নানা ঘাটতি রয়েছে, তবে অনগ্রসর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও বহুগুণ বেশি। এখানে বড় ধরনের ভাষাগত দূরত্ব রয়েছে। পাশাপাশি জমিজমার অধিকার প্রমাণের জন্য আদালতে যেসব কাগজপত্র উপস্থাপন করতে হয়, সেগুলো তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষিত থাকে না। আইনি বিধি অনুযায়ী তথ্য বা দলিল উপস্থাপন করতে না পারলে বিচার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি আরও যোগ করেন, বহু ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অন্যায় সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াই ধ্বংস হয়ে যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে হবে, তেমনি নাগরিককেও সঠিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আদালতের কাছে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিদ্যমান কাঠামোর ভেতর থেকেই সমাধানের সুযোগ

গবেষক, পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকারকর্মী পাভেল পার্থ মনে করেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আদিবাসীরা এসব সেবা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না; সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তারা এই সুযোগের কথাই জানেন না।

তিনি উল্লেখ করেন, ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বাজেট সভা কিংবা উপজেলা ও জেলার কোনো তথ্য অবহিতকরণ কার্যক্রমে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে; তারা একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে আছেন। ফলে নতুন কোনো কমিশন বা নতুন সমান্তরাল কাঠামো তৈরি করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নয়।

পাভেল পার্থ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত রয়েছে এবং সেখানে ১৩টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। অথচ এসব কমিটির কার্যক্রমে আদিবাসীদের সমস্যাগুলো কখনোই এজেন্ডা হিসেবে স্থান পায় না। একই দৃশ্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনেও বিদ্যমান।

তার মতে, রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য থেকেই এসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সংবেদনশীল ও সক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের আদিবাসীদের প্রথাগত সামাজিক নিয়ম, ভূমি বিরোধ ও নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশাসন আন্তরিক ও মানবিক হলে বর্তমান সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর থেকেই একজন বাঙালি নাগরিকের মতো সমতলের একজন আদিবাসীরও সমন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আদিবাসীদের জন্য যেসব ঐতিহ্যগত প্রথাগত নিয়ম চালু রয়েছে, রাষ্ট্রের বিদ্যমান অনেক আইনে তার কোনো স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রকে এই বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়ে তা আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিচারহীনতার পেছনে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অসংবেদনশীলতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। তাই তাদের জাতিগত স্বীকৃতি, সামাজিক মালিকানা ও প্রথাগত অধিকারকে আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন।

সংবিধানে বিশেষ বিধানের পূর্ণ সুযোগ রয়েছে

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত এ বিষয়ে জানান, মূল জনগোষ্ঠীর সাথে ভাষা, ভূখণ্ড ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরাসরি প্রতিযোগিতায় এসে সমতা রক্ষা করা কঠিন। তবে দেশের সংবিধান তাদের সুরক্ষায় বিশেষ সুযোগ ও বিধান প্রণয়নে কোনো বাধা রাখেনি।

তিনি সংবিধানের বিভিন্ন ধারা তুলে ধরে বলেন, সংবিধানে সরাসরি ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ২৩(ক) অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে গিয়ে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জন্য আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নির্দেশের পাশাপাশি নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির স্বার্থে রাষ্ট্রকে বিশেষ বিধান তৈরির অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই বিশেষ বিধানের সুযোগ বহাল রয়েছে।

আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত জোর দিয়ে বলেন, সাংবিধানিক এসব ধারা পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, আদিবাসী বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক আইনি ও সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্র যেকোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে; সমতার বিধান এক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।

তিনি মনে করেন, সমতলের আদিবাসীদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, শতভাগ নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা এবং অপরাধীকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করাই বিচারহীনতা দূর করার একমাত্র পথ। কোনো নাগরিকের মনেই যেন এই হতাশা তৈরি না হয় যে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়ার কারণে রাষ্ট্রে তার অভিযোগ কোনো গুরুত্ব পাবে না।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

কোরআনে বর্ণিত নিশ্চিত কবুল হওয়া ৩টি বিশেষ দোয়া

27 October 2026

গফরগাঁওয়ে চলন্ত তিস্তা এক্সপ্রেসের বগি বিচ্ছিন্ন, আধা ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

সংবিধানে রয়েছে বিশেষ সুরক্ষার সুযোগ: সমতলের আদিবাসীদের জন্য সংবেদনশীল ব্যবস্থার তাগিদ

হালনাগাদ সময় : ১০:০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার ও সংকট নিয়ে জাতীয় পরিসরে নিয়মিত আলোচনা হলেও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো অনেকটাই প্রচারের আড়ালে রয়ে গেছে। পৈতৃক জমি জবরদখল, মজুরি বৈষম্য, নারী নির্যাতন এবং উচ্ছেদের মতো বহুমুখী অপরাধের তারা নিয়মিত শিকার হলেও প্রতিকার পাওয়ার আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা অত্যন্ত সীমিত। মাঠপর্যায়ের নানা পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানে এমন বঞ্চনাময় চিত্রই ফুটে উঠেছে।

উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও এবং মাহাতো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়—থানায় কীভাবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে হয়, সরকারি বিনামূল্যে আইনি সহায়তা কীভাবে পেতে হয় কিংবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদনের নিয়মাবলি কী—এসব বিষয়ে তাদের সিংহভাগের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার এক সাঁওতাল কৃষকের কথায় তাদের অসহায়ত্বের স্বরূপ স্পষ্ট হয়। তিনি জানান, কোনো মারামারি বা বিবাদ ঘটলে তারা স্থানীয় মাতব্বরের শরণাপন্ন হন। থানা বা পুলিশ তাদের কাছে অনেক দূরের এবং ভীতিকর বিষয় মনে হয়; আইনি ব্যবস্থার জন্য কী কাগজপত্র প্রয়োজন হয় বা কোথায় যেতে হয়, সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

আদিবাসীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রধান বাধাগুলো

বসতভিটা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ কিংবা সহিংসতার শিকার হলে একজন সাধারণ আদিবাসী নাগরিক কোথায় আশ্রয় খুঁজবেন? নিয়ম অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে যেতে হয় নিকটস্থ থানায়। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়, সংকোচ এবং পুনরায় বঞ্চনার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই মূলত আদিবাসীদের মধ্যে থানায় যাওয়ার প্রবল অনীহা কাজ করে। অনেকের মনে এমন পূর্বধারণা বদ্ধমূল যে, তাদের কথা বা অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে না শুনেই একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিয়মিত নথিভুক্ত পরিসংখ্যান থাকলেও সমতলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পৃথক তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষিত নেই।

২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে তিন সাঁওতাল হত্যাকাণ্ডের ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও আজও সেই নির্মমতার বিচার নিশ্চিত হয়নি। অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই দীর্ঘস্থায়ী বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত অপরাধীদের বারবার উৎসাহিত করছে। এমনকি চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদাফার্ম এলাকায় পৈতৃক জমি ফেরত ও তিন সাঁওতাল হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশেও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমোন বাস্কে দৃঢ়তার সাথে জানান, ২০১৬ সালের সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং বাপ-দাদার জমি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

অভিযোগ দায়েরের আগেই সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা

অতীতের নানা তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যুগ যুগ ধরে এই জনপদে আদিবাসীদের ওপর নানা অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের বিচার পাওয়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী পল্লীর বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে বহুমুখী কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—অভিযোগ জানানোর আগেই পরিবারের অভ্যন্তরীণ বাধা, স্থানীয় সামাজিক আধিপত্যের কারণে নীরব থাকতে বাধ্য হওয়া এবং থানায় আদিবাসীবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থার চরম অনুপস্থিতি।

সমতলের একটি সাধারণ আদিবাসী পাড়ায় সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি প্রান্তিক পরিবার বসবাস করে, যার চারপাশ ঘেরা থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর গ্রাম দিয়ে। ফলে কোনো আদিবাসী নারী বাইরের কারও দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলে প্রথম বাধাটি আসে তাদের নিজেদের সমাজ থেকেই।

নওগাঁর এক আদিবাসী নারী জানান, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার প্রথম আঘাত এসে পড়ে পুরো পাড়ার ওপর। আইনি পদক্ষেপ বা অভিযোগ জানাতে গেলে গোটা পাড়ায় হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়, জমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি আসে, এমনকি স্থানীয় ইটভাটায় তাদের দিনমজুরির কাজও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে পাড়ার মাতব্বর বা পরিবারের প্রবীণরা বলেন—‘মুখ বন্ধ রাখো, তবেই পুরো গ্রাম রক্ষা পাবে।’

এর ফলে বহু গুরুতর ফৌজদারি অপরাধও থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় না; বরং স্থানীয় সালিশেই নামমাত্র মীমাংসা করে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সেখানে ভুক্তভোগী নারী হলেও তার নিজস্ব কোনো মতামত বা ক্ষোভের গুরুত্ব থাকে না। স্থানীয়দের মতে, এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক স্থায়ী সামাজিক অচলাবস্থা। আদিবাসী অধিকারকর্মী পপি রানী ভূমিজ সিং আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নির্যাতনের ঘটনায় প্রকৃত বিচার পাওয়ার নজির সমতলে নেই বললেই চলে।

থানায় যেতে অনীহা ও ভাষাগত দূরত্ব

থানা এড়িয়ে চলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্থানীয় এক নারী জানান, তাদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বাংলা ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন না। অথচ থানায় তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা বুঝতে পারার মতো কোনো লোক থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামের কোনো পুরুষকে সাথে নিয়ে যেতে হয়। এর সাথে যুক্ত হয় পুলিশের প্রতি একধরনের দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক ভয়।

এছাড়া শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মেডিকেল পরীক্ষা করানো তাদের জন্য আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই পথ পাড়ি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত যাতায়াত ভাড়া কিংবা সাথে যাওয়ার মতো কোনো পুরুষ অভিভাবক অনেক পরিবারের থাকে না। তাছাড়া হাসপাতালে পৌঁছে কার কাছে যেতে হবে, কীভাবে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে—সে সম্পর্কেও তাদের স্বচ্ছ জ্ঞান থাকে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কেউ যদি অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে চান, তবে তার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে। কোনো অভিযোগকারী ভিন্ন ভাষার হলে স্থানীয় দোভাষীর সহায়তায় অভিযোগ নথিবদ্ধ বা এজাহারভুক্ত করা হয়। মামলা রেকর্ডের আগে সেই দোভাষীর মাধ্যমে পুরো এজাহারটি অভিযোগকারীকে পড়ে শোনানো হয় এবং এরপরই আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু করা হয়ে থাকে।

আদালতে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ধকল

দেশে একটি নারী নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। একজন দিনমজুর আদিবাসী নারীর পক্ষে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়া চরম কষ্টসাধ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতি শুনানিতে আইনজীবীর চড়া ফি এবং দীর্ঘ পথের যাতায়াত ব্যয়।

সরকারি লিগ্যাল এইড ব্যবস্থা চালু থাকলেও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোতে আদিবাসী নারীদের সহায়তার জন্য কোনো স্বতন্ত্র বা বিশেষায়িত ডেস্ক নেই। তাছাড়া আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনি জটিল ভাষা এবং বাংলায় দ্রুত জেরা করার কারণে অনেক আদিবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়েন; কারণ কাঠগড়ায় তাদের জন্য কোনো অনুবাদকের ব্যবস্থা থাকে না। উপরন্তু মামলা করার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের হুমকিতে নিরাপত্তা হারিয়ে অনেক ভুক্তভোগীকে শেষ পর্যন্ত নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়।

ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সার্বিক সংকট নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, দেশে সাধারণ মানুষের জন্যই ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে নানা ঘাটতি রয়েছে, তবে অনগ্রসর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও বহুগুণ বেশি। এখানে বড় ধরনের ভাষাগত দূরত্ব রয়েছে। পাশাপাশি জমিজমার অধিকার প্রমাণের জন্য আদালতে যেসব কাগজপত্র উপস্থাপন করতে হয়, সেগুলো তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষিত থাকে না। আইনি বিধি অনুযায়ী তথ্য বা দলিল উপস্থাপন করতে না পারলে বিচার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি আরও যোগ করেন, বহু ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অন্যায় সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াই ধ্বংস হয়ে যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে হবে, তেমনি নাগরিককেও সঠিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে আদালতের কাছে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিদ্যমান কাঠামোর ভেতর থেকেই সমাধানের সুযোগ

গবেষক, পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকারকর্মী পাভেল পার্থ মনে করেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আদিবাসীরা এসব সেবা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না; সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তারা এই সুযোগের কথাই জানেন না।

তিনি উল্লেখ করেন, ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বাজেট সভা কিংবা উপজেলা ও জেলার কোনো তথ্য অবহিতকরণ কার্যক্রমে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে; তারা একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে আছেন। ফলে নতুন কোনো কমিশন বা নতুন সমান্তরাল কাঠামো তৈরি করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নয়।

পাভেল পার্থ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত রয়েছে এবং সেখানে ১৩টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। অথচ এসব কমিটির কার্যক্রমে আদিবাসীদের সমস্যাগুলো কখনোই এজেন্ডা হিসেবে স্থান পায় না। একই দৃশ্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনেও বিদ্যমান।

তার মতে, রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য থেকেই এসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সংবেদনশীল ও সক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের আদিবাসীদের প্রথাগত সামাজিক নিয়ম, ভূমি বিরোধ ও নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশাসন আন্তরিক ও মানবিক হলে বর্তমান সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর থেকেই একজন বাঙালি নাগরিকের মতো সমতলের একজন আদিবাসীরও সমন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আদিবাসীদের জন্য যেসব ঐতিহ্যগত প্রথাগত নিয়ম চালু রয়েছে, রাষ্ট্রের বিদ্যমান অনেক আইনে তার কোনো স্পষ্ট স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রকে এই বিষয়টির স্বীকৃতি দিয়ে তা আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিচারহীনতার পেছনে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অসংবেদনশীলতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। তাই তাদের জাতিগত স্বীকৃতি, সামাজিক মালিকানা ও প্রথাগত অধিকারকে আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন।

সংবিধানে বিশেষ বিধানের পূর্ণ সুযোগ রয়েছে

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত এ বিষয়ে জানান, মূল জনগোষ্ঠীর সাথে ভাষা, ভূখণ্ড ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরাসরি প্রতিযোগিতায় এসে সমতা রক্ষা করা কঠিন। তবে দেশের সংবিধান তাদের সুরক্ষায় বিশেষ সুযোগ ও বিধান প্রণয়নে কোনো বাধা রাখেনি।

তিনি সংবিধানের বিভিন্ন ধারা তুলে ধরে বলেন, সংবিধানে সরাসরি ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ২৩(ক) অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে গিয়ে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জন্য আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নির্দেশের পাশাপাশি নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির স্বার্থে রাষ্ট্রকে বিশেষ বিধান তৈরির অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই বিশেষ বিধানের সুযোগ বহাল রয়েছে।

আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত জোর দিয়ে বলেন, সাংবিধানিক এসব ধারা পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, আদিবাসী বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক আইনি ও সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্র যেকোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিতে পারে; সমতার বিধান এক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।

তিনি মনে করেন, সমতলের আদিবাসীদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা, শতভাগ নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা এবং অপরাধীকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করাই বিচারহীনতা দূর করার একমাত্র পথ। কোনো নাগরিকের মনেই যেন এই হতাশা তৈরি না হয় যে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হওয়ার কারণে রাষ্ট্রে তার অভিযোগ কোনো গুরুত্ব পাবে না।

Share this news as a Photo Card