মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৯:১০ পূর্বাহ্ন | ২৬শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার, ১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

ঐতিহাসিক ইসলামি অর্থব্যবস্থা: খলিফা ওমরের সময়ে বায়তুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর

  • হালনাগাদ সময় : ১২:১৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩০ বার পড়া হয়েছে

হিজরি ১৩ থেকে ২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়। মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে তখন জমা হচ্ছে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের রাজপ্রাসাদ থেকে সংগৃহীত বিজিত স্বর্ণালংকার, বহুমূল্য রত্নখচিত রাজমুকুট, পারস্য সম্রাট খসরুর দুর্লভ পোশাক এবং সিরিয়া ও মিসরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অগণিত স্বর্ণমুদ্রার স্তূপ। পারস্য বিজয়ের পর এই বিপুল বৈভব যখন মদিনায় এসে পৌঁছায়, তখন খলিফা ওমর তা দেখে আনন্দিত হওয়ার বদলে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি তখন অত্যন্ত অনুতাপের সুরে বলেছিলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত প্রাচুর্য অতীতের বহু জাতিকে বিভেদ ও পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে, এই আশঙ্কা আমি নিজেদের ক্ষেত্রেও করছি।’

সেটি ছিল দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর স্বর্ণোজ্জ্বল শাসনকাল। আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মুসলিম খেলাফত তখন দ্রুত একটি আন্তর্মহাদেশীয় সাম্রাজ্যের রূপ লাভ করছিল। নতুন নতুন ভূখণ্ড বিজয়ের ফলস্বরূপ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতে শুরু করে গনিমত, জিজিয়া, খারাজ ও ফায়ের মতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এই বিশাল অর্থনৈতিক বিস্তার রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক ও দূরবর্তী প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ সুসংগঠিত, দীর্ঘস্থায়ী ও সুষমভাবে বণ্টন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব? মূলত এই প্রশ্নের ব্যবহারিক উত্তর খোঁজার মাধ্যমেই বায়তুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে বায়তুল মাল প্রধানত একটি তাৎক্ষণিক বণ্টনকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হতো, যেখানে সংগৃহীত রাজস্ব দ্রুত নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হতো এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদি উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হতো না। কিন্তু ১৩ হিজরিতে ওমর (রা.) খিলাফতের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করার পর সম্প্রসারিত রাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে চলে আসে। বিজিত অঞ্চল থেকে নিয়মিত ও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসতে শুরু করায় একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী, প্রশাসন পরিচালন এবং সাধারণ জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য সুসংগঠিত একটি ‘কোষাগার ব্যবস্থা’ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে খলিফা ওমর (রা.) বায়তুল মালকে কেবল তাৎক্ষণিক বণ্টনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত, নীতিভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় রূপান্তর করার যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইরাকের উর্বর কৃষি অঞ্চল ‘সওয়াদ’ এবং সিরিয়া বিজয়ের পর বিজিত ভূমি ও বাইতুল মালের সার্বিক মালিকানা নিয়ে সমাজে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী সমাধান দিয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

এমবাপের জোড়া গোলে এল ক্লাসিকোয় বার্সার অপরাজেয় যাত্রা থামাল রিয়াল

25 October 2026

৪৫তম বিসিএস: বিসিএস প্রশাসনে সহকারী কমিশনার পদে ২৬৬ জনের নিয়োগ

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

ঐতিহাসিক ইসলামি অর্থব্যবস্থা: খলিফা ওমরের সময়ে বায়তুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর

হালনাগাদ সময় : ১২:১৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

হিজরি ১৩ থেকে ২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়। মদিনার মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে তখন জমা হচ্ছে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের রাজপ্রাসাদ থেকে সংগৃহীত বিজিত স্বর্ণালংকার, বহুমূল্য রত্নখচিত রাজমুকুট, পারস্য সম্রাট খসরুর দুর্লভ পোশাক এবং সিরিয়া ও মিসরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অগণিত স্বর্ণমুদ্রার স্তূপ। পারস্য বিজয়ের পর এই বিপুল বৈভব যখন মদিনায় এসে পৌঁছায়, তখন খলিফা ওমর তা দেখে আনন্দিত হওয়ার বদলে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি তখন অত্যন্ত অনুতাপের সুরে বলেছিলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত প্রাচুর্য অতীতের বহু জাতিকে বিভেদ ও পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে, এই আশঙ্কা আমি নিজেদের ক্ষেত্রেও করছি।’

সেটি ছিল দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর স্বর্ণোজ্জ্বল শাসনকাল। আরব উপদ্বীপের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মুসলিম খেলাফত তখন দ্রুত একটি আন্তর্মহাদেশীয় সাম্রাজ্যের রূপ লাভ করছিল। নতুন নতুন ভূখণ্ড বিজয়ের ফলস্বরূপ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতে শুরু করে গনিমত, জিজিয়া, খারাজ ও ফায়ের মতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এই বিশাল অর্থনৈতিক বিস্তার রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক ও দূরবর্তী প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ সুসংগঠিত, দীর্ঘস্থায়ী ও সুষমভাবে বণ্টন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব? মূলত এই প্রশ্নের ব্যবহারিক উত্তর খোঁজার মাধ্যমেই বায়তুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে বায়তুল মাল প্রধানত একটি তাৎক্ষণিক বণ্টনকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হতো, যেখানে সংগৃহীত রাজস্ব দ্রুত নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হতো এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদি উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হতো না। কিন্তু ১৩ হিজরিতে ওমর (রা.) খিলাফতের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করার পর সম্প্রসারিত রাষ্ট্রের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে চলে আসে। বিজিত অঞ্চল থেকে নিয়মিত ও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসতে শুরু করায় একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী, প্রশাসন পরিচালন এবং সাধারণ জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য সুসংগঠিত একটি ‘কোষাগার ব্যবস্থা’ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে খলিফা ওমর (রা.) বায়তুল মালকে কেবল তাৎক্ষণিক বণ্টনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত, নীতিভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় রূপান্তর করার যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইরাকের উর্বর কৃষি অঞ্চল ‘সওয়াদ’ এবং সিরিয়া বিজয়ের পর বিজিত ভূমি ও বাইতুল মালের সার্বিক মালিকানা নিয়ে সমাজে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী সমাধান দিয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

Share this news as a Photo Card