মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৪:১২ অপরাহ্ন | ৩০শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার, ১৪ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

ফিক্সড নাকি ফ্লোটিং: জাপানের ঋণের চড়া সুদ এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প ভাবছে বাংলাদেশ

  • হালনাগাদ সময় : ১১:৫০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত অংশীদার জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) দেওয়া ঋণের সুদের হার ক্রমাগত বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশকে নামমাত্র বা নমনীয় সুদে ঋণ দেওয়া দেশটি এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের ঋণের শর্তাবলী কঠোর করেছে। পাঁচ বছর আগেও যেখানে জাপানি ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১ শতাংশেরও নিচে, তা বেড়ে এখন ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দীর্ঘমেয়াদি স্থির (ফিক্সড) ঋণের ক্ষেত্রে এই সুদহার বেড়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এই অতিরিক্ত সুদের বোঝা এড়াতে প্রাথমিক কম সুদের ‘ভাসমান’ বা ফ্লোটিং ঋণের কথা বিবেচনা করছে সরকার, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এতে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে।

মেট্রোরেল, যমুনা রেলসেতু, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় মেগা প্রকল্পগুলোতে প্রধান অর্থায়নকারী ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে জাইকা। তবে সংস্থাটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের জন্য এককভাবে সুদহার নির্ধারণ করে না; বরং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ও উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ—এই তিন ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রেখেই ঋণ দিচ্ছে জাপান।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জাপানি ঋণের বার্ষিক সুদহার ছিল অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ০ দশমিক ০১ শতাংশ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে ২০১৮ সালে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ শতাংশে। ২০২০ সালের এপ্রিলেও এলডিসি দেশের জন্য জাইকার স্ট্যান্ডার্ড স্থির সুদের হার ছিল ০ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ঋণ শর্তাবলিতে তা বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে জাপানি ঋণের সুদের হার পাঁচগুণ বেড়েছে। এই সাধারণ স্থির ঋণের মেয়াদ ৩০ বছর, যার মধ্যে রয়েছে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড।

চড়া এই স্থির সুদ এড়াতে বাংলাদেশ এখন ভাসমান বা ফ্লোটিং সুদের দিকে নজর দিচ্ছে। ছয় মাস মেয়াদি টোকিও টার্ম রিস্ক-ফ্রি রেটকে (টিওআরএফ) ভিত্তি ধরে বর্তমান বাজারে প্রায় ১ দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ সুদে ফ্লোটিং ঋণ নেওয়া সম্ভব। তবে জাপানের বন্ড মার্কেটের অস্থিরতা এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর সুদের হার পর্যালোচনার নিয়মের কারণে দীর্ঘমেয়াদে টিওআরএফ রেট বেড়ে গেলে ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের ব্যয় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়।

ইআরডির যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম জানান, দেশের আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে সরকার ফিক্সডের পাশাপাশি ফ্লোটিং ঋণের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। তবে জাপানের মুদ্রা বিনিময় হার ও বন্ড মার্কেটের ওপর নির্ভর করায় ফ্লোটিং রেটে সুদের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি থেকেই যায়।

এদিকে ঋণের সুদ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মেগা প্রকল্পগুলোর খরচের ওপর। শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ চালুর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে এবং ব্যয় ৮৪৭ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকায়। একইভাবে এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫-এর ব্যয় ৪১ হাজার কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সতর্ক করে জানান, বাজেটে ঋণ পরিশোধের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে বৈদেশিক ঋণে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্লোটিং ঋণে মুদ্রা মিসম্যাচ ও বন্ডের অস্থিরতার ঝুঁকি থাকে। ঋণের অর্থ যদি সরাসরি দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে ভূমিকা না রাখে, তবে ডলার সংকটের এই সময়ে চড়া সুদের বিদেশি ঋণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

হঠাৎ অভিনয় ছাড়ার ঘোষণা দিলেন রাসেল মিয়া

30 October 2026

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি: বিমানে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

ফিক্সড নাকি ফ্লোটিং: জাপানের ঋণের চড়া সুদ এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প ভাবছে বাংলাদেশ

হালনাগাদ সময় : ১১:৫০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ও বিশ্বস্ত অংশীদার জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) দেওয়া ঋণের সুদের হার ক্রমাগত বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশকে নামমাত্র বা নমনীয় সুদে ঋণ দেওয়া দেশটি এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের ঋণের শর্তাবলী কঠোর করেছে। পাঁচ বছর আগেও যেখানে জাপানি ঋণের গড় সুদের হার ছিল ১ শতাংশেরও নিচে, তা বেড়ে এখন ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দীর্ঘমেয়াদি স্থির (ফিক্সড) ঋণের ক্ষেত্রে এই সুদহার বেড়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এই অতিরিক্ত সুদের বোঝা এড়াতে প্রাথমিক কম সুদের ‘ভাসমান’ বা ফ্লোটিং ঋণের কথা বিবেচনা করছে সরকার, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এতে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে।

মেট্রোরেল, যমুনা রেলসেতু, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো বড় মেগা প্রকল্পগুলোতে প্রধান অর্থায়নকারী ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে জাইকা। তবে সংস্থাটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের জন্য এককভাবে সুদহার নির্ধারণ করে না; বরং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ও উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ—এই তিন ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রেখেই ঋণ দিচ্ছে জাপান।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জাপানি ঋণের বার্ষিক সুদহার ছিল অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ০ দশমিক ০১ শতাংশ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে ২০১৮ সালে নতুন ঋণের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ শতাংশে। ২০২০ সালের এপ্রিলেও এলডিসি দেশের জন্য জাইকার স্ট্যান্ডার্ড স্থির সুদের হার ছিল ০ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ঋণ শর্তাবলিতে তা বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে জাপানি ঋণের সুদের হার পাঁচগুণ বেড়েছে। এই সাধারণ স্থির ঋণের মেয়াদ ৩০ বছর, যার মধ্যে রয়েছে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড।

চড়া এই স্থির সুদ এড়াতে বাংলাদেশ এখন ভাসমান বা ফ্লোটিং সুদের দিকে নজর দিচ্ছে। ছয় মাস মেয়াদি টোকিও টার্ম রিস্ক-ফ্রি রেটকে (টিওআরএফ) ভিত্তি ধরে বর্তমান বাজারে প্রায় ১ দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ সুদে ফ্লোটিং ঋণ নেওয়া সম্ভব। তবে জাপানের বন্ড মার্কেটের অস্থিরতা এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর সুদের হার পর্যালোচনার নিয়মের কারণে দীর্ঘমেয়াদে টিওআরএফ রেট বেড়ে গেলে ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের ব্যয় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়।

ইআরডির যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম জানান, দেশের আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে সরকার ফিক্সডের পাশাপাশি ফ্লোটিং ঋণের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। তবে জাপানের মুদ্রা বিনিময় হার ও বন্ড মার্কেটের ওপর নির্ভর করায় ফ্লোটিং রেটে সুদের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি থেকেই যায়।

এদিকে ঋণের সুদ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মেগা প্রকল্পগুলোর খরচের ওপর। শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ চালুর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে এবং ব্যয় ৮৪৭ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকায়। একইভাবে এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫-এর ব্যয় ৪১ হাজার কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি সতর্ক করে জানান, বাজেটে ঋণ পরিশোধের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে বৈদেশিক ঋণে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্লোটিং ঋণে মুদ্রা মিসম্যাচ ও বন্ডের অস্থিরতার ঝুঁকি থাকে। ঋণের অর্থ যদি সরাসরি দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে ভূমিকা না রাখে, তবে ডলার সংকটের এই সময়ে চড়া সুদের বিদেশি ঋণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

Share this news as a Photo Card