নবম পে-স্কেল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বস্তি ফিরেছে সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন স্কেল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করায় সংশ্লিষ্ট মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নতুন এই কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বিভিন্ন পদের অভ্যন্তরীণ বেতনবৈষম্য কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতের বিশাল শ্রমশক্তির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও দাবি সামনে আসছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রীয় আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমানের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এই বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের অনুপাত পূর্বের ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১০০ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১১ বছর আগে সর্বশেষ পে-স্কেল দেওয়া হয়েছিল, যার বিপরীতে দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান। ফলে বেতন সমন্বয়ের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজস্ব আহরণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মচারীরা আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, যা সরবরাহ ব্যবস্থা ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাঙা রাখবে।
অর্থনীতির ওপর হঠাৎ চাপ এবং বাজার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পুরো পে-স্কেল একবারে কার্যকর না করে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কৌশল নেওয়া হয়েছে। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিনটি ধাপে বৃদ্ধি পাবে এবং যাবতীয় ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
এদিকে সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরাও বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার জোর দাবি তুলেছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন পে-স্কেল ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, দ্রব্যমূল্যের চাপে শ্রমিকদের বেঁচে থাকার স্বার্থে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে যথাসময়ে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও শিল্পোদ্যোক্তা ফজলুল হক মনে করেন, নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ায় বাজারে তাৎক্ষণিক কোনো নেতিবাচক প্রভাব বা বাড়তি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নেই। তিনি জানান, রপ্তানি বাজারের সংকট ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে বেসরকারি খাত বর্তমানে একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পোশাকশিল্পে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এই পে-স্কেল ঘোষণা অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও সামগ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করে তা বাস্তবায়ন করাই এখন প্রধান বিষয়।


























