রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডাঙ্গিরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম, যিনি স্থানীয়ভাবে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় এবং শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
সম্প্রতি কলেজটির কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মো. মোনাব্বর হোসেন বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। সরকার কর্তৃক উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি সরকার বহন করার নিয়ম থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ সেই নীতিমালা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পুনরায় টিউশন ফি আদায় করছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফরম পূরণ ও ক্লাসে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে এবং অনেকে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ থেকেও পিছিয়ে পড়ছে।
অভিযোগে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, ২০২৪ সালের এইচএসসি ব্যাচের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীকে মডেল টেস্ট পরীক্ষায় পরিকল্পিতভাবে অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ওই শিক্ষার্থীরা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঝুঁকিতে পড়ে। পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, এটি ছিল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করে একটি সুপরিকল্পিত অর্থ বাণিজ্য।
কলেজের ডিজিটাল ল্যাব ও বিজ্ঞানাগার দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেলেও সংস্কার বা নতুন সরঞ্জাম কেনার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা জানান, ব্যবহারিক ক্লাস না হওয়ায় তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাব সংস্কার ও যন্ত্রপাতির নামে একাধিকবার বরাদ্দ এলেও তার সঠিক ব্যবহার হয়নি। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তির সময় বোর্ড নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত ফি না দিলে ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম পূর্ববর্তী সরকারের সময় তারাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন এবং রংপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরী ডিউকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে তিনি বছরের পর বছর বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শিক্ষক নিয়োগের নামে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যার একটি অংশ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পৌঁছাত বলেও স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বর্তমানে রংপুর শহরে পাঁচতলা ভবন, প্রাইভেট গাড়িসহ নিজ নাম ও স্ত্রীর নামে অঢেল সম্পত্তির মালিক, যা তার আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, ডাঙ্গিরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হালিম জানান, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে কলেজে না আসায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।
রিপোর্টারের নাম 




















