ঢাকা ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

হ্যান্ডশেকে হতে পারে এই রোগ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

## হ্যান্ডশেক থেকে টেনিস এলবো: একটি সাধারণ অথচ যন্ত্রণাদায়ক রোগ

ঢাকা: দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু কাজ বা অভ্যাস থেকেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘টেনিস এলবো’ নামক রোগটি। যদিও এর নাম টেনিস এলবো, তবে এটি কেবল টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায়শই দেখা যায়, যারা এই খেলাটি খেলেন না, তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে বারবার হ্যান্ডশেক করার মতো সাধারণ অভ্যাস থেকেও এই যন্ত্রণাদায়ক রোগটি বাসা বাঁধতে পারে।

রোগের কারণ ও আক্রান্তের হার:

টেনিস এলবো মূলত কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথার একটি রোগ। কনুইয়ের যে স্থান থেকে হাতের পেশি (টেনডন) শুরু হয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত চাপ পড়লে বা টান লাগলে এই সমস্যা দেখা দেয়। এটি একটি ডিজেনারেটিভ রোগ, যেখানে টেনডন ক্ষয় হতে থাকে। বয়স সাধারণত ৩৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সমান।

বিভিন্ন পেশা ও অভ্যাসের কারণে এই রোগটি বেশি দেখা যায়। যেমন:

খেলোয়াড়: যারা টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের মতো র‍্যাকেট খেলা খেলেন, বিশেষ করে যারা ভারী বা বেমানান হ্যান্ডেলের র‍্যাকেট ব্যবহার করেন।
কম্পিউটার ব্যবহারকারী: যারা দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার মাউস ব্যবহার করেন।
শারীরিক শ্রমজীবী: রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইটভাটার শ্রমিক, দরজি, গৃহিণী, পিয়ানো বা ড্রাম বাদক মিউজিশিয়ান এবং অর্থোপেডিক সার্জনদের মতো যারা বারবার কবজির কাজ করেন বা হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভারের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করেন।
অন্যান্য: মজার বিষয় হলো, যেসব রাজনীতিবিদদের নিয়মিত হ্যান্ডশেক করতে হয়, তাদেরও এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উপসর্গ:

টেনিস এলবো রোগের প্রধান উপসর্গ হলো কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথা। কোনো কিছু ধরতে গেলে, চাপ দিলে বা ভারী জিনিস টানতে গেলে এই ব্যথা তীব্র হতে পারে। বোতল খুলতে, হাত মেলাতে বা কলম ধরতেও কষ্ট হতে পারে। অনেক সময় এই ব্যথা কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা:

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টেনিস এলবো রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে বা এমআরআই (MRI) করার প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে অস্টিওকনডাইটিস ডেসিক্যান্স, রেডিয়াল টানেল সিন্ড্রোম, প্লাইকা সিন্ড্রোম বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস-এর মতো রোগ শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯০% রোগীই সাধারণ কিছু নিয়মে সেরে ওঠেন। এর মধ্যে রয়েছে:

সাধারণ চিকিৎসা: হাতের কবজির পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কাজ কমানো ও বিশ্রাম নেওয়া, বরফ সেঁক, ডাক্তারের পরামর্শে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন, কনুইয়ের বেল্ট (টেনিস এলবো স্ট্র্যাপ) এবং কবজির স্প্লিন্ট ব্যবহার করা।
ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি: পেশি টান দেওয়ার ব্যায়াম এবং ধীরে ধীরে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম নিয়মিত করলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়।
ইনজেকশন: দীর্ঘ দিন ধরে রোগ না সারলে স্টেরয়েড ইনজেকশন কার্যকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী রোগের ক্ষেত্রে বছরে একাধিকবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পিআরপি (PRP) ইনজেকশন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় ভালো ফল দেয়।
অপারেশন: খুব কম সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। নিয়ম মেনে চিকিৎসা করলে সাধারণত অপারেশন লাগে না। তবে ৬-১২ মাস চিকিৎসা করার পরও যদি রোগ না সারে বা দৈনন্দিন কাজ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিরোধ:

কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে টেনিস এলবো অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে:

কাজ ও খেলাধুলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা।
একই ধরনের কাজ দীর্ঘক্ষণ না করে মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়া।
ভারী জিনিস তোলার সময় কনুইয়ের পরিবর্তে কাঁধ ও শরীর ব্যবহার করা।
খেলাধুলায় ভুল স্ট্রোক এড়িয়ে চলা এবং র‍্যাকেট বা ব্যাটের গ্রিপ সাইজ ঠিক রাখা।
কাজের আগে ও পরে ফোরআর্ম স্ট্রেচিং করা।
কবজি ও কনুইয়ের হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা।
হঠাৎ ভারী ব্যায়াম শুরু না করা।
কম্পিউটার ব্যবহারের সময় কি-বোর্ড-মাউসের উচ্চতা ঠিক রাখা এবং কবজি সোজা রেখে কাজ করা।
দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে বিরতি নেওয়া।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় কাউন্টারফোর্স ব্রেস এবং খেলাধুলার সময় এলবো স্ট্র্যাপ ব্যবহার করা।
ব্যায়ামের পরে বরফ সেঁক নেওয়া এবং কাজের পর হালকা ম্যাসাজ করা।
ব্যথা শুরু হলে জোর করে কাজ চালিয়ে না গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং ধীরে ধীরে কাজের মাত্রা বাড়ানো।

মনে রাখতে হবে, প্রতিরোধই চিকিৎসার সেরা উপায়। আর ব্যথা শুরু হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা, আহত ২

হ্যান্ডশেকে হতে পারে এই রোগ

আপডেট সময় : ০৩:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

## হ্যান্ডশেক থেকে টেনিস এলবো: একটি সাধারণ অথচ যন্ত্রণাদায়ক রোগ

ঢাকা: দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু কাজ বা অভ্যাস থেকেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘টেনিস এলবো’ নামক রোগটি। যদিও এর নাম টেনিস এলবো, তবে এটি কেবল টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায়শই দেখা যায়, যারা এই খেলাটি খেলেন না, তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে বারবার হ্যান্ডশেক করার মতো সাধারণ অভ্যাস থেকেও এই যন্ত্রণাদায়ক রোগটি বাসা বাঁধতে পারে।

রোগের কারণ ও আক্রান্তের হার:

টেনিস এলবো মূলত কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথার একটি রোগ। কনুইয়ের যে স্থান থেকে হাতের পেশি (টেনডন) শুরু হয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত চাপ পড়লে বা টান লাগলে এই সমস্যা দেখা দেয়। এটি একটি ডিজেনারেটিভ রোগ, যেখানে টেনডন ক্ষয় হতে থাকে। বয়স সাধারণত ৩৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সমান।

বিভিন্ন পেশা ও অভ্যাসের কারণে এই রোগটি বেশি দেখা যায়। যেমন:

খেলোয়াড়: যারা টেনিস বা ব্যাডমিন্টনের মতো র‍্যাকেট খেলা খেলেন, বিশেষ করে যারা ভারী বা বেমানান হ্যান্ডেলের র‍্যাকেট ব্যবহার করেন।
কম্পিউটার ব্যবহারকারী: যারা দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার মাউস ব্যবহার করেন।
শারীরিক শ্রমজীবী: রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইটভাটার শ্রমিক, দরজি, গৃহিণী, পিয়ানো বা ড্রাম বাদক মিউজিশিয়ান এবং অর্থোপেডিক সার্জনদের মতো যারা বারবার কবজির কাজ করেন বা হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভারের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করেন।
অন্যান্য: মজার বিষয় হলো, যেসব রাজনীতিবিদদের নিয়মিত হ্যান্ডশেক করতে হয়, তাদেরও এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উপসর্গ:

টেনিস এলবো রোগের প্রধান উপসর্গ হলো কনুইয়ের বাইরের অংশে ব্যথা। কোনো কিছু ধরতে গেলে, চাপ দিলে বা ভারী জিনিস টানতে গেলে এই ব্যথা তীব্র হতে পারে। বোতল খুলতে, হাত মেলাতে বা কলম ধরতেও কষ্ট হতে পারে। অনেক সময় এই ব্যথা কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা:

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টেনিস এলবো রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে বা এমআরআই (MRI) করার প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে অস্টিওকনডাইটিস ডেসিক্যান্স, রেডিয়াল টানেল সিন্ড্রোম, প্লাইকা সিন্ড্রোম বা অস্টিওআর্থ্রাইটিস-এর মতো রোগ শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯০% রোগীই সাধারণ কিছু নিয়মে সেরে ওঠেন। এর মধ্যে রয়েছে:

সাধারণ চিকিৎসা: হাতের কবজির পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কাজ কমানো ও বিশ্রাম নেওয়া, বরফ সেঁক, ডাক্তারের পরামর্শে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন, কনুইয়ের বেল্ট (টেনিস এলবো স্ট্র্যাপ) এবং কবজির স্প্লিন্ট ব্যবহার করা।
ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি: পেশি টান দেওয়ার ব্যায়াম এবং ধীরে ধীরে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম নিয়মিত করলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়।
ইনজেকশন: দীর্ঘ দিন ধরে রোগ না সারলে স্টেরয়েড ইনজেকশন কার্যকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী রোগের ক্ষেত্রে বছরে একাধিকবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পিআরপি (PRP) ইনজেকশন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় ভালো ফল দেয়।
অপারেশন: খুব কম সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। নিয়ম মেনে চিকিৎসা করলে সাধারণত অপারেশন লাগে না। তবে ৬-১২ মাস চিকিৎসা করার পরও যদি রোগ না সারে বা দৈনন্দিন কাজ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিরোধ:

কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে টেনিস এলবো অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে:

কাজ ও খেলাধুলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা।
একই ধরনের কাজ দীর্ঘক্ষণ না করে মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়া।
ভারী জিনিস তোলার সময় কনুইয়ের পরিবর্তে কাঁধ ও শরীর ব্যবহার করা।
খেলাধুলায় ভুল স্ট্রোক এড়িয়ে চলা এবং র‍্যাকেট বা ব্যাটের গ্রিপ সাইজ ঠিক রাখা।
কাজের আগে ও পরে ফোরআর্ম স্ট্রেচিং করা।
কবজি ও কনুইয়ের হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা।
হঠাৎ ভারী ব্যায়াম শুরু না করা।
কম্পিউটার ব্যবহারের সময় কি-বোর্ড-মাউসের উচ্চতা ঠিক রাখা এবং কবজি সোজা রেখে কাজ করা।
দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে বিরতি নেওয়া।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সময় কাউন্টারফোর্স ব্রেস এবং খেলাধুলার সময় এলবো স্ট্র্যাপ ব্যবহার করা।
ব্যায়ামের পরে বরফ সেঁক নেওয়া এবং কাজের পর হালকা ম্যাসাজ করা।
ব্যথা শুরু হলে জোর করে কাজ চালিয়ে না গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং ধীরে ধীরে কাজের মাত্রা বাড়ানো।

মনে রাখতে হবে, প্রতিরোধই চিকিৎসার সেরা উপায়। আর ব্যথা শুরু হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।