ঢাকা ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রমণ শিশুর জন্মগত হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে জন্মগত হৃদরোগের প্রকোপ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি হাজারে প্রায় ৮ থেকে ১০ জন শিশু জন্মগতভাবে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে, কিছু গবেষণায় এই হার আরও বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাটির কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমরা শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ তানভীর ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

শিশুদের হৃদরোগ: জন্মগত নাকি অর্জিত?

শিশুদের হৃদরোগ প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, জন্মগত হৃদরোগ, যা শিশুর মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই তৈরি হয়। এর মধ্যে হার্টে ছিদ্র (যেমন: এএসডি, ভিএসডি, পিডিএ), ভালভের সমস্যা, হার্টের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিক অবস্থান বা জন্মগতভাবে হার্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া অন্যতম। দ্বিতীয়ত, জন্ম-পরবর্তী অর্জিত হৃদরোগ, যা সাধারণত বাতজ্বর, বিভিন্ন সংক্রমণ, হার্টের টিউমার বা অন্যান্য কারণে পরে তৈরি হয়।

বাংলাদেশে শিশু হৃদরোগের প্রধান কারণসমূহ

বাংলাদেশে শিশু হৃদরোগের হার উদ্বেগজনক। প্রতি হাজারে ৮-১০ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা একটি বড় সংখ্যা। অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, যা উন্নত দেশগুলোতেও একটি সাধারণ চিত্র। তবে, যেসব কারণ চিহ্নিত করা গেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

জেনেটিক কারণ: পরিবারের অন্য সদস্যের হৃদরোগ থাকলে শিশুরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য: অপুষ্টি, ভাইরাল সংক্রমণ অথবা গর্ভাবস্থায় মায়ের অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা শিশুর হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
পরিবেশ দূষণ: বায়ু এবং অন্যান্য পরিবেশগত দূষণ শিশুর হৃদযন্ত্রের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যে ভেজাল: অস্বাস্থ্যকর এবং ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণও একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অভিভাবকদের জন্য জরুরি লক্ষণসমূহ

শিশুদের হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। যে লক্ষণগুলোর প্রতি বিশেষ নজর রাখা উচিত সেগুলো হলো:

ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি ও নিউমোনিয়া: শিশুরা যদি অল্পতেই ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।
অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা: শিশু যদি একটু হাঁটাচলা বা দৌড়ানোর পরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নবজাতকরা বুকের দুধ খাওয়ার সময়ও ক্লান্ত হয়ে থেমে থেমে খেতে পারে।
অতিরিক্ত ঘাম: স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘাম হওয়া, এমনকি কান্না করার সময়েও যদি শিশুর শরীর অতিরিক্ত ঘামে।
শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: অন্য শিশুদের তুলনায় শিশুর ওজন বৃদ্ধি বা সামগ্রিক শারীরিক বিকাশ কম হওয়া।
ত্বকের নীলচে ভাব: কিছু জন্মগত হৃদরোগে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে শিশুর জিহ্বা, ঠোঁট বা হাতের আঙুল নীলচে বা কালচে হয়ে যেতে পারে।

শিশু হৃদরোগ নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি

শিশু হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এক্স-রে এবং ইসিজি (ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হয়, যা হার্টের প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে, রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতি হলো ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ইকো)। এই পরীক্ষার মাধ্যমে হার্টের গঠন, কার্যক্ষমতা এবং সমস্যার পরিমাণ বিস্তারিতভাবে জানা যায়। কিছু জটিল ক্ষেত্রে হার্টের এনজিওগ্রাম করার প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা এবং দেশের সক্ষমতা

কিছু জন্মগত হৃদরোগ স্বাভাবিকভাবেই সেরে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি না হলে রোগ নিরাময় সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক শিশুর হার্টের ছিদ্র বা অন্যান্য সমস্যা ‘ইন্টারভেনশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে (যেমন: ডিভাইস স্থাপন, বেলুনিং, স্টেন্টিং) সারিয়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে উন্নতমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এবং বেশিরভাগ জটিলতাই সফলভাবে সারানো সম্ভব। তবে, অত্যন্ত বিরল এবং জটিল কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা, আহত ২

গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রমণ শিশুর জন্মগত হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়

আপডেট সময় : ০৩:২৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে জন্মগত হৃদরোগের প্রকোপ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি হাজারে প্রায় ৮ থেকে ১০ জন শিশু জন্মগতভাবে হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে, কিছু গবেষণায় এই হার আরও বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাটির কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমরা শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ তানভীর ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

শিশুদের হৃদরোগ: জন্মগত নাকি অর্জিত?

শিশুদের হৃদরোগ প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, জন্মগত হৃদরোগ, যা শিশুর মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই তৈরি হয়। এর মধ্যে হার্টে ছিদ্র (যেমন: এএসডি, ভিএসডি, পিডিএ), ভালভের সমস্যা, হার্টের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিক অবস্থান বা জন্মগতভাবে হার্টের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া অন্যতম। দ্বিতীয়ত, জন্ম-পরবর্তী অর্জিত হৃদরোগ, যা সাধারণত বাতজ্বর, বিভিন্ন সংক্রমণ, হার্টের টিউমার বা অন্যান্য কারণে পরে তৈরি হয়।

বাংলাদেশে শিশু হৃদরোগের প্রধান কারণসমূহ

বাংলাদেশে শিশু হৃদরোগের হার উদ্বেগজনক। প্রতি হাজারে ৮-১০ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা একটি বড় সংখ্যা। অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, যা উন্নত দেশগুলোতেও একটি সাধারণ চিত্র। তবে, যেসব কারণ চিহ্নিত করা গেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

জেনেটিক কারণ: পরিবারের অন্য সদস্যের হৃদরোগ থাকলে শিশুরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য: অপুষ্টি, ভাইরাল সংক্রমণ অথবা গর্ভাবস্থায় মায়ের অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা শিশুর হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
পরিবেশ দূষণ: বায়ু এবং অন্যান্য পরিবেশগত দূষণ শিশুর হৃদযন্ত্রের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যে ভেজাল: অস্বাস্থ্যকর এবং ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণও একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অভিভাবকদের জন্য জরুরি লক্ষণসমূহ

শিশুদের হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। যে লক্ষণগুলোর প্রতি বিশেষ নজর রাখা উচিত সেগুলো হলো:

ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি ও নিউমোনিয়া: শিশুরা যদি অল্পতেই ঘন ঘন ঠান্ডা-কাশি বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।
অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা: শিশু যদি একটু হাঁটাচলা বা দৌড়ানোর পরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নবজাতকরা বুকের দুধ খাওয়ার সময়ও ক্লান্ত হয়ে থেমে থেমে খেতে পারে।
অতিরিক্ত ঘাম: স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘাম হওয়া, এমনকি কান্না করার সময়েও যদি শিশুর শরীর অতিরিক্ত ঘামে।
শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: অন্য শিশুদের তুলনায় শিশুর ওজন বৃদ্ধি বা সামগ্রিক শারীরিক বিকাশ কম হওয়া।
ত্বকের নীলচে ভাব: কিছু জন্মগত হৃদরোগে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে শিশুর জিহ্বা, ঠোঁট বা হাতের আঙুল নীলচে বা কালচে হয়ে যেতে পারে।

শিশু হৃদরোগ নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি

শিশু হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এক্স-রে এবং ইসিজি (ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হয়, যা হার্টের প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে, রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে কার্যকর ও আধুনিক পদ্ধতি হলো ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ইকো)। এই পরীক্ষার মাধ্যমে হার্টের গঠন, কার্যক্ষমতা এবং সমস্যার পরিমাণ বিস্তারিতভাবে জানা যায়। কিছু জটিল ক্ষেত্রে হার্টের এনজিওগ্রাম করার প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসা এবং দেশের সক্ষমতা

কিছু জন্মগত হৃদরোগ স্বাভাবিকভাবেই সেরে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি না হলে রোগ নিরাময় সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক শিশুর হার্টের ছিদ্র বা অন্যান্য সমস্যা ‘ইন্টারভেনশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে (যেমন: ডিভাইস স্থাপন, বেলুনিং, স্টেন্টিং) সারিয়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে উন্নতমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এবং বেশিরভাগ জটিলতাই সফলভাবে সারানো সম্ভব। তবে, অত্যন্ত বিরল এবং জটিল কিছু ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।