ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় সহসা চোখে পড়ে মালেকা বেগমের (ছদ্মনাম) ক্লান্ত মুখ। হাতে কিছু কাগজপত্র, চোখে রাজ্যের ক্লান্তি। তিন সন্তানের জননী এই নারী দীর্ঘ দিন ধরে নিজের অজান্তেই এক মরণব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন। মাসের পর মাস ধরে চলা অস্বাভাবিক রক্তপাতকে তিনি ভেবেছিলেন সাধারণ নারীজনিত সমস্যা। লজ্জা, ভয় এবং রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব তাঁকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বিলম্বিত করেছে। এই বিলম্বই তাঁকে মুখোমুখি করেছে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মতো এক মরণব্যাধির, যা বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জরায়ুমুখের ক্যান্সার একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এর প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটে অজান্তেই এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। বছরের পর বছর ধরে এই সংক্রমণ নীরবে শরীরের ভেতরে বিস্তার লাভ করে এবং একসময় মরণব্যাধি ক্যান্সারে রূপ নেয়।
তবে আশার কথা হলো, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে যে সকল নারী যৌনভাবে সক্রিয়, তাদের জন্য নিয়মিত জরায়ুমুখের স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। প্যাপ স্মিয়ার (Pap smear) বা এইচপিভি (HPV) পরীক্ষার মাধ্যমে জরায়ুমুখের কোষের অস্বাভাবিকতা বা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। এই পরীক্ষাগুলো তুলনামূলকভাবে সহজ, কম ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রণাহীন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে এইচপিভি টিকা গ্রহণ, যা অল্পবয়সী মেয়েদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই রোগ সম্পর্কে মানুষকে অবগত করা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। মালেকা বেগমের মতো অনেক নারীই হয়তো সঠিক তথ্যের অভাবে বা সামাজিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতাই পারে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে অসংখ্য নারীকে রক্ষা করতে।
রিপোর্টারের নাম 

























