ঢাকা ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

ভারতীয় সুতার আগ্রাসনে ঝুঁকিতে বস্ত্রখাতের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ: বিপর্যয়ের মুখে দেশীয় মিলগুলো

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:২০:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বস্ত্রখাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ‘ডাম্পিং’ মূল্যে সস্তা সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের বাজার দখলের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের ওপারে সুতা রপ্তানির জন্য অর্ধশতাধিক ওয়্যারহাউস বা গুদাম স্থাপন করা হয়। বর্তমান সরকার স্থলপথে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করার পর ভারত ‘প্রাইস ডাম্পিং’-এর কৌশল গ্রহণ করেছে। কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় ভারত সরকার সুতা ও কাপড় রপ্তানিতে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদান করছে। ফলে ভারতীয় সুতা দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সাময়িকভাবে সাশ্রয়ী মনে হলেও, তা দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর জন্য ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশে সুতা ও কাপড় আমদানির হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে ভারত থেকে ৪২৯ মিলিয়ন ডলারের সুতা এলেও ২০২৩ সালে তা লাফিয়ে ১.১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে এই আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২৮ বিলিয়ন ডলারে। তুলা ও কৃত্রিম ফাইবারসহ সামগ্রিক সুতা খাতে আমদানির পরিমাণ ৩.২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই আসছে ভারত থেকে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারতীয় সুতা বর্তমানে বাজারে ‘ডাম্পিং প্রাইসে’ বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ভারতীয় সুতার গড় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ২.১৯ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের মিলগুলোর উৎপাদন খরচই পড়ছে ২.৩৯ ডলার। ভারতীয় রপ্তানিকারকরা তাদের সরকারের কাছ থেকে ৩.৮৮ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়ায় এবং সীমান্তের কাছে গুদাম থাকায় খুব দ্রুত ও কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। এর ফলে পোশাক শিল্প মালিকরা স্থানীয় মিলের পরিবর্তে ভারতীয় সুতার দিকে ঝুঁকছেন, যা দেশীয় মিলগুলোকে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য করছে।

বিটিএমএ-র তথ্যমতে, দেশের ৫২৭টি সুতাকল, ৯৯৪টি কাপড় কল এবং ৩৪২টি ডাইং-প্রিন্টিং কারখানা বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে। বিনিয়োগ ঝুঁকির কারণে গত তিন বছরে এই খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসেনি, উল্টো ৩০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতে যথাযথ তদারকির অভাবে ঘোষণার চেয়ে বেশি সুতা এবং উচ্চ কাউন্টের সুতা নিম্ন কাউন্টের ঘোষণা দিয়ে পাচার করা হচ্ছে। বন্ড সুবিধায় আনা এসব সুতা খোলা বাজারে চলে আসায় অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে স্থানীয় শিল্প।

এদিকে, বিগত সরকারের আমলে দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে দেশীয় বস্ত্র খাতের ‘সেইফগার্ড’ বা সুরক্ষা সুবিধাগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এলডিসি উত্তরণের অজুহাতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভর্তুকি কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়। অথচ একই সময়ে ভারত তাদের রপ্তানি প্রণোদনা আরও বাড়িয়েছে। এই নীতিগত বৈষম্য দেশীয় শিল্পকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের নির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বা বন্ড সুবিধা বন্ধের সুপারিশ করেছে। স্থানীয় স্পিনাররা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর বিরোধিতা করছে। পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, স্থানীয় মিলের তুলনায় আমদানিকৃত সুতার দাম কম হওয়ায় তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন। আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত নিম্নমানের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাতের সুনাম রক্ষায় এবং ২৫ বিলিয়ন ডলারের দেশীয় বিনিয়োগ বাঁচাতে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি সহায়তা এখন সময়ের দাবি। দেশীয় বস্ত্রকলগুলো রক্ষা না পেলে ভবিষ্যতে সুতার জন্য সম্পূর্ণভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির বড় অংশ বরাদ্দের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

ভারতীয় সুতার আগ্রাসনে ঝুঁকিতে বস্ত্রখাতের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ: বিপর্যয়ের মুখে দেশীয় মিলগুলো

আপডেট সময় : ০৬:২০:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বস্ত্রখাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ‘ডাম্পিং’ মূল্যে সস্তা সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের বাজার দখলের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের ওপারে সুতা রপ্তানির জন্য অর্ধশতাধিক ওয়্যারহাউস বা গুদাম স্থাপন করা হয়। বর্তমান সরকার স্থলপথে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করার পর ভারত ‘প্রাইস ডাম্পিং’-এর কৌশল গ্রহণ করেছে। কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় ভারত সরকার সুতা ও কাপড় রপ্তানিতে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদান করছে। ফলে ভারতীয় সুতা দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সাময়িকভাবে সাশ্রয়ী মনে হলেও, তা দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর জন্য ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সাল থেকে দেশে সুতা ও কাপড় আমদানির হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২ সালে ভারত থেকে ৪২৯ মিলিয়ন ডলারের সুতা এলেও ২০২৩ সালে তা লাফিয়ে ১.১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে এই আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.২৮ বিলিয়ন ডলারে। তুলা ও কৃত্রিম ফাইবারসহ সামগ্রিক সুতা খাতে আমদানির পরিমাণ ৩.২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই আসছে ভারত থেকে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারতীয় সুতা বর্তমানে বাজারে ‘ডাম্পিং প্রাইসে’ বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ভারতীয় সুতার গড় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ২.১৯ ডলার, যেখানে বাংলাদেশের মিলগুলোর উৎপাদন খরচই পড়ছে ২.৩৯ ডলার। ভারতীয় রপ্তানিকারকরা তাদের সরকারের কাছ থেকে ৩.৮৮ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি পাওয়ায় এবং সীমান্তের কাছে গুদাম থাকায় খুব দ্রুত ও কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। এর ফলে পোশাক শিল্প মালিকরা স্থানীয় মিলের পরিবর্তে ভারতীয় সুতার দিকে ঝুঁকছেন, যা দেশীয় মিলগুলোকে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য করছে।

বিটিএমএ-র তথ্যমতে, দেশের ৫২৭টি সুতাকল, ৯৯৪টি কাপড় কল এবং ৩৪২টি ডাইং-প্রিন্টিং কারখানা বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে। বিনিয়োগ ঝুঁকির কারণে গত তিন বছরে এই খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসেনি, উল্টো ৩০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থলবন্দরগুলোতে যথাযথ তদারকির অভাবে ঘোষণার চেয়ে বেশি সুতা এবং উচ্চ কাউন্টের সুতা নিম্ন কাউন্টের ঘোষণা দিয়ে পাচার করা হচ্ছে। বন্ড সুবিধায় আনা এসব সুতা খোলা বাজারে চলে আসায় অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে স্থানীয় শিল্প।

এদিকে, বিগত সরকারের আমলে দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে দেশীয় বস্ত্র খাতের ‘সেইফগার্ড’ বা সুরক্ষা সুবিধাগুলো প্রত্যাহার করা হয়। এলডিসি উত্তরণের অজুহাতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভর্তুকি কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়। অথচ একই সময়ে ভারত তাদের রপ্তানি প্রণোদনা আরও বাড়িয়েছে। এই নীতিগত বৈষম্য দেশীয় শিল্পকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের নির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বা বন্ড সুবিধা বন্ধের সুপারিশ করেছে। স্থানীয় স্পিনাররা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর বিরোধিতা করছে। পোশাক রপ্তানিকারকদের দাবি, স্থানীয় মিলের তুলনায় আমদানিকৃত সুতার দাম কম হওয়ায় তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন। আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত নিম্নমানের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি খাতের সুনাম রক্ষায় এবং ২৫ বিলিয়ন ডলারের দেশীয় বিনিয়োগ বাঁচাতে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি সহায়তা এখন সময়ের দাবি। দেশীয় বস্ত্রকলগুলো রক্ষা না পেলে ভবিষ্যতে সুতার জন্য সম্পূর্ণভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।