ঢাকা ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ঢাকা: ২০৫০ সালে বিশ্বের বৃহত্তম মহানগরের পথে কিন্তু বাসযোগ্যতায় এখনো তলানিতে

কনকনে শীতের ভোরে কাঁঠালবাগানের এক খণ্ডকালীন গৃহকর্মী এবং তার গৃহকর্তার প্রাত্যহিক জীবনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে ঢাকা শহরের এক নিদারুণ বাস্তবতা। একজন ৩৫ বছর আগে অভাবের তাড়নায় জামালপুর থেকে এসেছেন, অন্যজন চার দশক আগে উচ্চশিক্ষার টানে খুলনা থেকে এসে থিতু হয়েছেন। এভাবে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গড়ে ২,১০৪ জন নতুন মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বর্তমানে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটি। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ, যা শহরটিকে বিশ্বের ১ নম্বর জনবহুল মহানগরে পরিণত করবে।

ঢাকার এই বিশালত্ব রাজউকের আওতাভুক্ত ১,৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ। অথচ এই এক শতাংশ জায়গায় দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বসবাস করছে। অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ঢাকার আকার বাড়লেও এর গুণগত মান বাড়েনি; বরং এটি একটি ‘দুর্বল অর্থনৈতিক ভূগোলের বিস্তার’। রাজধানী হলেও ঢাকা থেকে এখনো গ্রামীণ আমেজ দূর হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে হাট বসে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর শহরটি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমানে ঢাকা মহানগরের মধ্যে চারটি সিটি করপোরেশন এবং ২৭টি সংসদীয় আসন থাকলেও শহরটি সেভাবে বসবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি।

ঢাকা এখন মূলত বস্তির শহর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মিলিয়ে বস্তির সংখ্যা ৪,৭৬১টি হলেও পুরো মহানগরে এটি পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এসব বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শহরের কোনো কোনো বস্তিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে, যা পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ জনঘনত্ব। গবেষক সাবিনা ফয়েজ রশীদের মতে, এই জীবনযাত্রার মান নৈতিকভাবে একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। বস্তিগুলোতে অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ এবং অপরাধের হার বেশি থাকলেও নাগরিক পরিষেবার সুযোগ অত্যন্ত নগণ্য।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাসযোগ্যতার বিচারে ঢাকা এখনো তলানির দিকে। ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১ নম্বরে। প্রতিদিনের বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের তালিকায়ও ঢাকা প্রায়ই শীর্ষ পর্যায়ে থাকে। যানজট নিরসনে মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্প চালু হলেও বিশাল জনসংখ্যার চাপে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, ধুলার উপদ্রব এবং অনুজ্জ্বল পরিবেশ শহরটিকে মলিন করে রেখেছে।

সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঢাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের জিডিপিতে ঢাকার অবদান ২০ শতাংশ এবং তৈরি পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশই এই মহানগর এলাকায় অবস্থিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ অভাবের তাড়নায় বারবার এই শহরেই ছুটে আসছে। নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকা একটি আধুনিক মেট্রোপলিটন হয়ে ওঠার বদলে দিন দিন একটি ঘিঞ্জি ও বৈষম্যপূর্ণ বিশাল জনপদে পরিণত হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আজ

ঢাকা: ২০৫০ সালে বিশ্বের বৃহত্তম মহানগরের পথে কিন্তু বাসযোগ্যতায় এখনো তলানিতে

আপডেট সময় : ০৫:৫৫:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

কনকনে শীতের ভোরে কাঁঠালবাগানের এক খণ্ডকালীন গৃহকর্মী এবং তার গৃহকর্তার প্রাত্যহিক জীবনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে ঢাকা শহরের এক নিদারুণ বাস্তবতা। একজন ৩৫ বছর আগে অভাবের তাড়নায় জামালপুর থেকে এসেছেন, অন্যজন চার দশক আগে উচ্চশিক্ষার টানে খুলনা থেকে এসে থিতু হয়েছেন। এভাবে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গড়ে ২,১০৪ জন নতুন মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বর্তমানে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটি। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ, যা শহরটিকে বিশ্বের ১ নম্বর জনবহুল মহানগরে পরিণত করবে।

ঢাকার এই বিশালত্ব রাজউকের আওতাভুক্ত ১,৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ। অথচ এই এক শতাংশ জায়গায় দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বসবাস করছে। অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, ঢাকার আকার বাড়লেও এর গুণগত মান বাড়েনি; বরং এটি একটি ‘দুর্বল অর্থনৈতিক ভূগোলের বিস্তার’। রাজধানী হলেও ঢাকা থেকে এখনো গ্রামীণ আমেজ দূর হয়নি, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে হাট বসে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর শহরটি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বর্তমানে ঢাকা মহানগরের মধ্যে চারটি সিটি করপোরেশন এবং ২৭টি সংসদীয় আসন থাকলেও শহরটি সেভাবে বসবাসের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি।

ঢাকা এখন মূলত বস্তির শহর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্যমতে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মিলিয়ে বস্তির সংখ্যা ৪,৭৬১টি হলেও পুরো মহানগরে এটি পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এসব বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শহরের কোনো কোনো বস্তিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে, যা পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ জনঘনত্ব। গবেষক সাবিনা ফয়েজ রশীদের মতে, এই জীবনযাত্রার মান নৈতিকভাবে একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। বস্তিগুলোতে অপুষ্টি, বাল্যবিবাহ এবং অপরাধের হার বেশি থাকলেও নাগরিক পরিষেবার সুযোগ অত্যন্ত নগণ্য।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাসযোগ্যতার বিচারে ঢাকা এখনো তলানির দিকে। ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১ নম্বরে। প্রতিদিনের বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের তালিকায়ও ঢাকা প্রায়ই শীর্ষ পর্যায়ে থাকে। যানজট নিরসনে মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্প চালু হলেও বিশাল জনসংখ্যার চাপে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, ধুলার উপদ্রব এবং অনুজ্জ্বল পরিবেশ শহরটিকে মলিন করে রেখেছে।

সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঢাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের জিডিপিতে ঢাকার অবদান ২০ শতাংশ এবং তৈরি পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশই এই মহানগর এলাকায় অবস্থিত। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ অভাবের তাড়নায় বারবার এই শহরেই ছুটে আসছে। নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকা একটি আধুনিক মেট্রোপলিটন হয়ে ওঠার বদলে দিন দিন একটি ঘিঞ্জি ও বৈষম্যপূর্ণ বিশাল জনপদে পরিণত হচ্ছে।