২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ড- বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকে চূর্ণ করে দেয়া ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম, পরিকল্পিত এবং রহস্যজটিল সামরিক হত্যাযজ্ঞ। দীর্ঘ তদন্ত, অসংখ্য রিপোর্ট, বহু মিথ্যাচার- এর মাঝেও গঠিত কমিশনের গোপনীয় পর্যবেক্ষণ ও দোষ প্রমাণের তালিকা আজও পুরো জাতির সামনে জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে। স্বাধীন জাতীয় কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই চূড়ান্ত তালিকা- যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামরিক, পুলিশ, গোয়েন্দা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দগদগে চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই রিপোর্টের উদ্দেশ্য পরিষ্কার : কারা ব্যর্থ হলেন? কারা ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত বিপথে নিলেন? কারা সাহায্য করলেন হত্যাকারীদের? রাষ্ট্র কি নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল?
এনএসআই : গোয়েন্দা ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দু
মেজর জেনারেল শেখ মুনিরুল ইসলাম ব্যর্থতার প্রশ্নে প্রধান অভিযুক্ত। কমিশনের ভাষ্য অনুসারে, এনএসআই মহাপরিচালক হিসেবে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পূর্বে বিপজ্জনক উত্তেজনা ও অসন্তোষের কোনো গোয়েন্দা সঙ্কেত সংগ্রহে ব্যর্থ হন তিনি। এতে সিদ্ধান্ত আসে তার গোয়েন্দা অক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা।
এরপর মেজর জেনারেল টিএম জোবায়ের তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেয়ার সক্রিয় চেষ্টা করেন। তিনি অফিসার প্রত্যাহারের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেন এবং পরিকল্পিতভাবে ঘটনাকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। তার বিষয়ে কমিশনের মত হলো- তিনি তদন্তে বাধা দিয়েছেন এবং সত্য গোপন করেছেন।
র্যাব নেতৃত্ব : নিষ্ক্রিয়তার নামে অপরাধে সহায়তা
তৎকালীন ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার ‘অকার্যকর র্যাব’কে ইচ্ছাকৃত নীরব রাখার জন্য অভিযুক্ত। তার ব্যাপারে কমিশনের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত কঠোর। কমিশন মনে করে- তিনি ঘটনা চলাকালেই র্যাবকে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন। যার ফলে ঘটেছে হত্যা, ধর্ষণ, লাশ গুম, আলামত ধ্বংস, অস্ত্র লুট, অপরাধীদের পলায়ন। এমনকি কমিশন ইঙ্গিত দেয়- এটি ছিল প্রশাসনের একটি ‘সাংগঠনিক পঙ্গুত্ব’, যা কারো কারো সক্রিয় রাজনৈতিক নির্দেশেই সম্ভব হয়েছে।
মেজর জেনারেল রেজানূর খানের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ হলো- তিনি দায়িত্ব ত্যাগ, বাধা, নির্যাতনে সহায়তা করেছেন। তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগের সংখ্যা ভয়াবহ যার মধ্যে রয়েছে- দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে সময় নষ্ট করা; র্যাবের অগ্রবর্তী দলকে পিলখানায় ঢুকতে বাধা দেয়া; তদন্ত ব্যাহত করা; অভিযুক্ত অফিসারদের উপর নির্যাতনে সহায়তা (তাপস হত্যাচেষ্টা কেস) এবং স্টাফদের স্ত্রীদের হুমকি দেয়া। কমিশনের মতে, এই তালিকা শুধু ব্যর্থতার নয়- একটি গোটা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক পতনকে প্রকাশ করে।
মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের ব্যাপারে সাক্ষী গুমের অভিযোগ রয়েছে। তার ব্যাপারে কমিশনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ অভিযোগ- ‘সাক্ষী গুম ও হত্যা।’ এটি তদন্তকে ভেঙে ফেলেছিল বলে মনে করে তদন্ত কমিশন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিম আহমেদ তদন্তের গতিপথ বিকৃতকরণ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ভয়াবহ অসুস্থতার কারণে তার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব হয়নি, তবে কমিশন তাকে দায়ী করেছে তদন্তকে বিভ্রান্তিমূলক খাতে পরিচালনা করার জন্য।
২০০৯ সালের তদন্ত কমিটি : শুরু থেকেই ‘ফরমায়েশি’
ঘটনা সম্পর্কে গঠিত আনিস-উজ-জামান কমিটি রাজনৈতিক ফরমায়েশে গঠিত এবং সত্য উপেক্ষা করেছে বলে মনে করে স্বাধীন তদন্ত কমিশন। এই কমিটি সম্পর্কে কমিশনের মন্তব্য-ফরমায়েশি তদন্ত ও কমিশনের সামনে সাক্ষ্য না দিয়ে অসহযোগিতা করার। বলা হয়েছে- এটি ছিল তদন্তের প্রথম স্তরে সত্য গোপনের বড় উদাহরণ।
লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর কমিটি সম্পর্কে বলা হয়েছে- তদন্তকালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এলেও তা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি আর তথ্য গোপন করে মূল অপরাধীদের আড়াল করা হয়।
বিডিআর নেতৃত্ব : দুর্বল প্রশাসন থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার
মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বিষয়ে কমিশনের কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ অনুসারে তিনি অনিয়মকে প্রশ্রয় দান; কমান্ডে শিথিলতা প্রদর্শন; সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য না পাঠানো ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এই ব্যর্থতা বিদ্রোহের আগুনকে অদৃশ্যভাবে শক্তিশালী করেছিল।
অন্য দিকে কর্নেল মুজিবুল হককে অনিয়মে প্রশ্রয়দাতা, কর্নেল সাইদুল কবিরকে প্রশাসনিক অবহেলা ও নিয়মবহির্ভূত সুপারিশ, লে. কর্নেল ফোরকান আহমদকে ইউনিটের ষড়যন্ত্র নজরদারিতে ব্যর্থ হওয়া, মেজর গোলাম মাহবুবুল আলমের বিষয়ে অবৈধ সুবিধা নেয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার, সাক্ষ্য এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে কমিশন। বলা হয়েছে এগুলো পরিষ্কার করে দেয়- বিডিআরের ভেতরে গভীর দুর্নীতি, অকার্যকর কমান্ড ও নেতৃত্বের অভাব বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে।
পুলিশ : ব্যর্থতার সর্ববৃহৎ চিত্র
কমিশনের মতে, আইজিপি নূর মোহাম্মদ- ব্যর্থতার বহুমাত্রিক উদাহরণ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ শাস্তিযোগ্য পর্যায়ের। এর মধ্যে রয়েছে জমা দেয়া অস্ত্র যথাযথভাবে হেফাজতে না নেয়া, পুলিশের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, নিজের মেয়েকে উদ্ধার করলেও অন্য জিম্মিদের ফেলে যাওয়া, সত্য গোপন করা এবং অপরাধীদের পালাতে সাহায্যকারী নীরবতা। কমিশন মনে করে- এটি ছিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের চরম অবহেলা।
ডিএমপি কমিশনার নাইম আহমেদের বিষয়ে ক্রাইম সিন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও অপরাধীর পলায়ন নিশ্চিত করা, এসবি অতিরিক্ত আইজি বাহারুল আলমের মিথ্যা তথ্য ও ভ্রান্ত বিবৃতি দেয়া, অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামের বিষয়ে সেনা অফিসারদের ফাঁসাতে ডিজিএফআইকে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দের বিষয়ে তদন্ত বিকৃতির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে- নারী, শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা না করা, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের নাম বাদ দেয়া, প্রযুক্তিগত প্রমাণ গোপন রাখা, সেনা অফিসারদের হত্যাকারীদের তদন্ত না করা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জিজ্ঞাসাবাদ এড়িয়ে যাওয়া। কমিশনের মতে, এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে তদন্ত বাঁকানোর সবচেয়ে সংগঠিত উদাহরণ।
মিডিয়া : সাংবাদিকতার নামে প্রচারণা
কমিশনের প্রতিবেদনে মুন্নী সাহাকে পক্ষপাতী প্রতিবেদন ও বিদ্রোহকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। মনজুরুল আহসান বুলবুলকে নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। জহিরুল ইসলাম মামুনকে অপপ্রচারের মাধ্যমে বিদ্রোহ উৎসাহিত করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কমিশন স্পষ্ট বলেছে- মিডিয়ার অংশবিশেষ বিদ্রোহের বিস্তারে সহায়তা করেছে।
রাজনৈতিক সমর্থন : মিছিল, স্লোগান, বিদ্রোহীদের রসদ- সবই পরিকল্পিত
কমিশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে- আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা গেটের সামনে মিছিল করেছে; ‘জয় বাংলা, জয় বিডিআর’ সেøাগান দিয়েছে; যুবকদের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের কাছে খাবার, সিগারেট সরবরাহ করেছে; এবং মিছিলের মাধ্যমে হত্যাকারীদের বের করে দেয়ায় সাহায্য করেছে।
কমিশনের মতে- এসব ঘটনার নথিভুক্তি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে- বিদ্রোহের সময় পিলখানার বাইরে সহায়তার নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল।
লাশ উদ্ধার : অদক্ষতা, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা
লাশ উদ্ধারে অদক্ষতা, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে- মৃতদেহ উদ্ধার ও হস্তান্তরে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা; তিনটি লাশ অতিরিক্ত, তিন পরিবারের লাশ হারানো এবং ডিএনএ টেস্ট না করেই লাশ হস্তান্তর। এসব কিছু তদন্ত ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এটি তদন্তকারীদের অযোগ্যতার নগ্ন দৃষ্টান্ত বলে কমিশন উল্লেখ করেছে।
নতুন ডিজি মইনুল ইসলামের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা : বিদ্রোহ পরবর্তী নতুন ডিজি মেজর জেনারেল মইনুল ইসলামের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিশন। বলা হয়েছে তদন্ত চলাকালেই পুলিশ কর্মকর্তা কাহার আকন্দের সাথে অভিযুক্ত অনেকের সন্দেহজনক সম্পর্ক গড়ে ওঠে; বিষয়টি জানানো হলেও তিনি ব্যবস্থা নেননি আর বিডিআরের পুনর্গঠনে প্রশাসনিক মনোযোগ দিয়ে তদন্তের গভীরতা উপেক্ষা করা হয়েছে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড- রাষ্ট্র আর কবে সত্য প্রকাশ করবে?
এই কমিশন-নথির তালিকা শুধু ব্যর্থতার নয়- এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা কাঠামো ও গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ পচনকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। যদি এত বিশদ দোষের তালিকা থাকা সত্ত্বেও আজও কেউ জবাবদিহির মুখোমুখি না হন- তা হলে এটি কেবল একটি হত্যাযজ্ঞ নয়; একটি রাষ্ট্রের নৈতিক মৃত্যু সমতুল্য।
বাংলাদেশের মানুষের প্রশ্ন এখনো একই- পিলখানার রক্তের দায় কার? রাষ্ট্র কি সত্য লুকিয়ে রাখছে? কার নির্দেশে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেয়া হয়েছিল? এই স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে ছুড়ে দিল- উত্তর : দায়ীদের মুখোশ খুলতেই হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























