মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন | ৩১শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার, ১৫ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

এশিয়ার যেখানে ‘অতিথি ভগবান’

  • হালনাগাদ সময় : ০৪:১৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

হিমালয় এবং কাঠমান্ডুর প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্র থেকে ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে তেরাইয়ের সমতলভূমি। মানুষের ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, প্রকৃতির মাঝে বন্যপ্রাণিতে ভরা জাতীয় উদ্যান, বিস্তৃত চাষের জমি এবং স্থানীয়দের মাঝে থেকে জীবনে দুদণ্ড শান্তির জন্য গঠিত হয়েছে কমিউনিটি হোম স্টে নেটওয়ার্ক। এখানেই অবস্থিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান লুম্বিনি, যেখানে জন্মেছিলেন গৌতম বুদ্ধ।

গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনি। ছবি: আলামিগৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনি। ছবি: আলামি

তেরাই অঞ্চলের বড় আকর্ষণ হলো প্রাচীন থারু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। এছাড়া রয়েছে বন্যপ্রাণীর সমৃদ্ধ সমারোহ। শুক্লাফাঁটা উদ্যান তার চিত্রা হরিণের দল ও বৃহত্তম বারাসিঙ্গার জন্য বিখ্যাত। বারদিয়া পরিচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য। আর চিতওয়ানে রয়েছে বাঘ, হাতি ও একশিঙা গন্ডার।

স্থানীয় বাসিন্দা হারিরাম চৌধুরি বলেন, আমাদের সমাজে অতিথিকে দেবতার মতো মানা হয়—এটাই থারু আতিথেয়তা।

এই হোম স্টে নেটওয়ার্ক স্থানীয়দের জীবনেও, বিশেষত নারীদের জন্য এক ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নারীরা জানান, পর্যটক আসায় গ্রামটি পরিচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নারীদের নিজস্ব আয় তৈরি হয়েছে।

হারিরাম বলেন, গ্রামে নারীদের কর্মসংস্থান সীমিত হলেও হোমস্টের আয় তাদের নতুন আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে। আমরা এখন আয় করতে পারি, নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা নিতে পারছি।

স্থানীয়রা অতিথিদের একদম আপন করে নেন। এই প্রতিবেদক সেখানকার আউলি উৎসব, যা ধান কাটার মৌসুম শেষে আনন্দ এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য পালিত হয়, সেখানে আমন্ত্রণ পান। তার আপ্যায়নকারী শ্যাম চৌধুরি তাকে সঙ্গে নিয়েই বিশেষ ধরনের ফলের আচার তৈরি করেন।

থারুদের খাবারে অন্যতম উপাদান ফলমূল। ছবি: সাইমন আরউইনথারুদের খাবারে অন্যতম উপাদান ফলমূল। ছবি: সাইমন আরউইন

নাচ, গান আর পাতা সেলাই করে বানানো কাপের চ্যাং—চালের তৈরি এক ধরনের সুরা এবং গাছের ফুল থেকে তৈরি মিষ্টি খাবার নিয়ে জমে ওঠে উৎসব। অনুষ্ঠানটিতে স্বাগত জানান গ্রামের গুরুয়া—আনিমিস্ট পুরোহিত ও গ্রাম-আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যস্থতাকারী এবং সেখানকার ১০টি হোমস্টের নারীরা।

ইউনেসকো স্বীকৃত চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে প্রতি বছর কয়েক লাখ পর্যটক যান। তবে উদ্যানসংলগ্ন কমিউনিটি ফরেস্টগুলোতেও সমান জীববৈচিত্র্য থাকলেও ভিড় অনেক কম। সেখানেই যাওয়ার জন্য যাত্রা চলে যায় বারাউলি গ্রামে—শান্ত কুনজ, নমুনা, কৃষ্ণ সার ও গুন্দ্রাহী দহ কমিউনিটি বনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার।

১২টি হোমস্টের সমন্বয়ে গড়া বারাউলিতে পর্যটকদের পালাক্রমে থাকার ব্যবস্থা করা হয় যেন সবার আয় নিশ্চিত হয়। সেখানে জানাকি মহাতোর হোমস্টেতে অতিথিকে স্বাগত জানান তিনি। মহাতো বলেন, পর্যটকদের আগ্রহ আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আমার গর্ব বাড়িয়েছে।

হোমস্টেতে আধুনিক স্যানিটেশন, এয়ারকন্ডিশনিংসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হয়। তিনি জানান, অতিথির দেওয়া অর্থের ৮০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তারা পান, বাকিটা কমিউনিটি ফান্ডে যায়। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে স্থানীয় স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এখানে গ্রামের মানুষরা বেশি উপকৃত হচ্ছেন—কারও আয় বাড়ছে অতিথিদের খাবার সরবরাহ করে, কেউ আয় করছেন হেনা আর্ট শেখানো বা মাউন্টেন বাইক রাইড করিয়ে।

প্রতিবেদককে পরদিন সাফারিতে নিয়ে যান স্থানীয় কৃষক এবং গাইড সুমিত চৌধুরি। তিনি জানান, চিতওয়ানে যেদিন ডজন ডজন জিপ ঢোকে, সেদিন কমিউনিটি ফরেস্টে সাধারণত মাত্র দুইটি গাড়ি যায়।

এখনও মানুষের লোভের শিকার না হওয়ায় অক্ষত আছেন সেখানকার প্রাণ প্রকৃতি। ছবি: সাইমন আরউইনএখনও মানুষের লোভের শিকার না হওয়ায় অক্ষত আছেন সেখানকার প্রাণ প্রকৃতি। ছবি: সাইমন আরউইন

মানুষের করাল গ্রাসমুক্ত থাকায়, সেখানে সহজেই দেখা মেলে বানরের দল, বুনো শূকর, বারাসিঙ্গা, জঙ্গলের মুরগি, ময়ূর, হর্নবিল ও সারসের। দেখা যায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি টের পেয়ে হরিণের সতর্ক সংকেত।

একশিঙা গণ্ডার। ছবি: সাইমন আরউইনএকশিঙা গণ্ডার। ছবি: সাইমন আরউইন

সুমিত বলেন, কমিউনিটি পর্যটন এখানকার মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক বদলে দিয়েছে। আগে অনেকেই প্রাণীদের শুধুই ফসলের ক্ষতিকারক হিসেবে দেখতেন, এখন সুরক্ষার মূল্য বুঝছেন।

তিনি বলেন, এটাই হওয়া উচিত পর্যটনের মডেল—প্রকৃতিকে ভালোবাসলে সে তাকে ফিরিয়ে দেয়। মানুষ, প্রকৃতি ও পর্যটক—সবাই উপকৃত হয়।

সূত্র: বিবিসি

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

নারীদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুখোমুখি কীর্তি ও রাধিকা, ওটিটিতে ঝড় তুলেছে ‘আক্কা’

30 October 2026

তিন আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশের সিনেমা 'মাস্টার'

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

এশিয়ার যেখানে ‘অতিথি ভগবান’

হালনাগাদ সময় : ০৪:১৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

হিমালয় এবং কাঠমান্ডুর প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্র থেকে ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে তেরাইয়ের সমতলভূমি। মানুষের ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, প্রকৃতির মাঝে বন্যপ্রাণিতে ভরা জাতীয় উদ্যান, বিস্তৃত চাষের জমি এবং স্থানীয়দের মাঝে থেকে জীবনে দুদণ্ড শান্তির জন্য গঠিত হয়েছে কমিউনিটি হোম স্টে নেটওয়ার্ক। এখানেই অবস্থিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান লুম্বিনি, যেখানে জন্মেছিলেন গৌতম বুদ্ধ।

গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনি। ছবি: আলামিগৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনি। ছবি: আলামি

তেরাই অঞ্চলের বড় আকর্ষণ হলো প্রাচীন থারু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। এছাড়া রয়েছে বন্যপ্রাণীর সমৃদ্ধ সমারোহ। শুক্লাফাঁটা উদ্যান তার চিত্রা হরিণের দল ও বৃহত্তম বারাসিঙ্গার জন্য বিখ্যাত। বারদিয়া পরিচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য। আর চিতওয়ানে রয়েছে বাঘ, হাতি ও একশিঙা গন্ডার।

স্থানীয় বাসিন্দা হারিরাম চৌধুরি বলেন, আমাদের সমাজে অতিথিকে দেবতার মতো মানা হয়—এটাই থারু আতিথেয়তা।

এই হোম স্টে নেটওয়ার্ক স্থানীয়দের জীবনেও, বিশেষত নারীদের জন্য এক ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নারীরা জানান, পর্যটক আসায় গ্রামটি পরিচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নারীদের নিজস্ব আয় তৈরি হয়েছে।

হারিরাম বলেন, গ্রামে নারীদের কর্মসংস্থান সীমিত হলেও হোমস্টের আয় তাদের নতুন আর্থিক স্বাধীনতা দিয়েছে। আমরা এখন আয় করতে পারি, নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা নিতে পারছি।

স্থানীয়রা অতিথিদের একদম আপন করে নেন। এই প্রতিবেদক সেখানকার আউলি উৎসব, যা ধান কাটার মৌসুম শেষে আনন্দ এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য পালিত হয়, সেখানে আমন্ত্রণ পান। তার আপ্যায়নকারী শ্যাম চৌধুরি তাকে সঙ্গে নিয়েই বিশেষ ধরনের ফলের আচার তৈরি করেন।

থারুদের খাবারে অন্যতম উপাদান ফলমূল। ছবি: সাইমন আরউইনথারুদের খাবারে অন্যতম উপাদান ফলমূল। ছবি: সাইমন আরউইন

নাচ, গান আর পাতা সেলাই করে বানানো কাপের চ্যাং—চালের তৈরি এক ধরনের সুরা এবং গাছের ফুল থেকে তৈরি মিষ্টি খাবার নিয়ে জমে ওঠে উৎসব। অনুষ্ঠানটিতে স্বাগত জানান গ্রামের গুরুয়া—আনিমিস্ট পুরোহিত ও গ্রাম-আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যস্থতাকারী এবং সেখানকার ১০টি হোমস্টের নারীরা।

ইউনেসকো স্বীকৃত চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে প্রতি বছর কয়েক লাখ পর্যটক যান। তবে উদ্যানসংলগ্ন কমিউনিটি ফরেস্টগুলোতেও সমান জীববৈচিত্র্য থাকলেও ভিড় অনেক কম। সেখানেই যাওয়ার জন্য যাত্রা চলে যায় বারাউলি গ্রামে—শান্ত কুনজ, নমুনা, কৃষ্ণ সার ও গুন্দ্রাহী দহ কমিউনিটি বনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার।

১২টি হোমস্টের সমন্বয়ে গড়া বারাউলিতে পর্যটকদের পালাক্রমে থাকার ব্যবস্থা করা হয় যেন সবার আয় নিশ্চিত হয়। সেখানে জানাকি মহাতোর হোমস্টেতে অতিথিকে স্বাগত জানান তিনি। মহাতো বলেন, পর্যটকদের আগ্রহ আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আমার গর্ব বাড়িয়েছে।

হোমস্টেতে আধুনিক স্যানিটেশন, এয়ারকন্ডিশনিংসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হয়। তিনি জানান, অতিথির দেওয়া অর্থের ৮০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তারা পান, বাকিটা কমিউনিটি ফান্ডে যায়। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে স্থানীয় স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এখানে গ্রামের মানুষরা বেশি উপকৃত হচ্ছেন—কারও আয় বাড়ছে অতিথিদের খাবার সরবরাহ করে, কেউ আয় করছেন হেনা আর্ট শেখানো বা মাউন্টেন বাইক রাইড করিয়ে।

প্রতিবেদককে পরদিন সাফারিতে নিয়ে যান স্থানীয় কৃষক এবং গাইড সুমিত চৌধুরি। তিনি জানান, চিতওয়ানে যেদিন ডজন ডজন জিপ ঢোকে, সেদিন কমিউনিটি ফরেস্টে সাধারণত মাত্র দুইটি গাড়ি যায়।

এখনও মানুষের লোভের শিকার না হওয়ায় অক্ষত আছেন সেখানকার প্রাণ প্রকৃতি। ছবি: সাইমন আরউইনএখনও মানুষের লোভের শিকার না হওয়ায় অক্ষত আছেন সেখানকার প্রাণ প্রকৃতি। ছবি: সাইমন আরউইন

মানুষের করাল গ্রাসমুক্ত থাকায়, সেখানে সহজেই দেখা মেলে বানরের দল, বুনো শূকর, বারাসিঙ্গা, জঙ্গলের মুরগি, ময়ূর, হর্নবিল ও সারসের। দেখা যায় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি টের পেয়ে হরিণের সতর্ক সংকেত।

একশিঙা গণ্ডার। ছবি: সাইমন আরউইনএকশিঙা গণ্ডার। ছবি: সাইমন আরউইন

সুমিত বলেন, কমিউনিটি পর্যটন এখানকার মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক বদলে দিয়েছে। আগে অনেকেই প্রাণীদের শুধুই ফসলের ক্ষতিকারক হিসেবে দেখতেন, এখন সুরক্ষার মূল্য বুঝছেন।

তিনি বলেন, এটাই হওয়া উচিত পর্যটনের মডেল—প্রকৃতিকে ভালোবাসলে সে তাকে ফিরিয়ে দেয়। মানুষ, প্রকৃতি ও পর্যটক—সবাই উপকৃত হয়।

সূত্র: বিবিসি

Share this news as a Photo Card