মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৩:০৮ অপরাহ্ন | ২৬শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার, ১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

রূপসী সুন্দরবন

  • হালনাগাদ সময় : ০১:৪৬:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬
  • ১৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত অপূর্ব রূপসী প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুন্দরবন শুধু দেশের গর্ব নয়, এটি বিশ্বের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপে গড়ে ওঠা এই বিশাল বনভূমি জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের এক অনন্য ভান্ডার। প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।

সুন্দরবনের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশ বাংলাদেশের মধ্যে এবং বাকিটুকু অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। এখানে নদী, খাল, কাদা-মাটি ও চিরসবুজ ম্যানগ্রোভ গাছ মিলিয়ে এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যপট গড়ে উঠেছে। নদীর লবণাক্ত পানি আর জোয়ার-ভাটার খেলায় বনটির প্রকৃতি প্রতিনিয়ত বদলে যায়। এ যেন প্রকৃতির জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা প্রতিদিন নতুন রূপে সেজে ওঠে।

সুন্দরবন শুধু গাছের বন নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাণের রাজ্য। এখানে রয়েছে ৪৫০টিরও বেশি বন্যপ্রাণী ও অসংখ্য গাছপালা। সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণ নিঃসন্দেহে রয়েল বেঙ্গল টাইগার—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যময় বাঘ প্রজাতি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু। এছাড়া এখানে পাওয়া যায়—হরিণ, বানর, বন্য শূকর ,কুমির, গুইসাপ, নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, বক, মাছরাঙা, বকুল, ফিঙে, পায়রা, সাদা বকসহ অসংখ্য পাখি, ডলফিন, উভচর প্রাণী ও দুর্লভ কচ্ছপ। প্রতিটি প্রাণই সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সুন্দরবনের নামকরণই এসেছে সুন্দরী গাছ থেকে, যা এখানে প্রচুর জন্মায়। পাশাপাশি জন্মায় গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, গোলপাতাসহ বহু ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ। বর্ষাকালে বনভূমি এক রহস্যময় সবুজ রূপে ভরে ওঠে আর শীতে কুয়াশাচ্ছন্ন নদী-খাল যেন এক স্বপ্নরাজ্যে রূপ নেয়।

সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং আশপাশের লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার ভিত্তি। মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল, মাছ ধরার জেলে, কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারীরা এ বন থেকে জীবিকার সন্ধান পায়। একই সঙ্গে সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে—ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয় থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করে।

১৯৯৭ সালে ইউনেসকো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এর অপরূপ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, বিরল প্রাণী ও পরিবেশগত গুরুত্বের জন্য এটি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী, পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

এত মনোরম সুন্দরবন আজ নানা সংকটে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বনাঞ্চল ধ্বংস, নদীদূষণ ও অবৈধ শিকার এই বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কমে যাওয়া ও কুমির, ডলফিন প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি এ বনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মুকুট, পৃথিবীর সবুজ হৃদয়ের স্পন্দন। এর প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী, প্রতিটি প্রাণ প্রকৃতির এক অসাধারণ সুরেলা কাব্যের অংশ। আমরা যদি একে সযত্নে লালন করি, তবে সুন্দরবন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য থাকবে এক অমূল্য ধন হিসেবে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

লক্ষ্মীপুরে মাদক সংক্রান্ত বিরোধের জেরে যুবককে কুপিয়ে হত্যা

26 October 2026

বিরোধী দলে থাকতেই দাফনে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবে জামায়াত: প্রশ্ন তাসনিম জারার

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

রূপসী সুন্দরবন

হালনাগাদ সময় : ০১:৪৬:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত অপূর্ব রূপসী প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুন্দরবন শুধু দেশের গর্ব নয়, এটি বিশ্বের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপে গড়ে ওঠা এই বিশাল বনভূমি জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের এক অনন্য ভান্ডার। প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।

সুন্দরবনের প্রায় ৬০ শতাংশ অংশ বাংলাদেশের মধ্যে এবং বাকিটুকু অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। এখানে নদী, খাল, কাদা-মাটি ও চিরসবুজ ম্যানগ্রোভ গাছ মিলিয়ে এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যপট গড়ে উঠেছে। নদীর লবণাক্ত পানি আর জোয়ার-ভাটার খেলায় বনটির প্রকৃতি প্রতিনিয়ত বদলে যায়। এ যেন প্রকৃতির জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা প্রতিদিন নতুন রূপে সেজে ওঠে।

সুন্দরবন শুধু গাছের বন নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাণের রাজ্য। এখানে রয়েছে ৪৫০টিরও বেশি বন্যপ্রাণী ও অসংখ্য গাছপালা। সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণ নিঃসন্দেহে রয়েল বেঙ্গল টাইগার—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রহস্যময় বাঘ প্রজাতি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু। এছাড়া এখানে পাওয়া যায়—হরিণ, বানর, বন্য শূকর ,কুমির, গুইসাপ, নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, বক, মাছরাঙা, বকুল, ফিঙে, পায়রা, সাদা বকসহ অসংখ্য পাখি, ডলফিন, উভচর প্রাণী ও দুর্লভ কচ্ছপ। প্রতিটি প্রাণই সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সুন্দরবনের নামকরণই এসেছে সুন্দরী গাছ থেকে, যা এখানে প্রচুর জন্মায়। পাশাপাশি জন্মায় গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, গোলপাতাসহ বহু ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ। বর্ষাকালে বনভূমি এক রহস্যময় সবুজ রূপে ভরে ওঠে আর শীতে কুয়াশাচ্ছন্ন নদী-খাল যেন এক স্বপ্নরাজ্যে রূপ নেয়।

সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, বরং আশপাশের লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার ভিত্তি। মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল, মাছ ধরার জেলে, কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহকারীরা এ বন থেকে জীবিকার সন্ধান পায়। একই সঙ্গে সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে—ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয় থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করে।

১৯৯৭ সালে ইউনেসকো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এর অপরূপ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, বিরল প্রাণী ও পরিবেশগত গুরুত্বের জন্য এটি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানী, পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

এত মনোরম সুন্দরবন আজ নানা সংকটে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বনাঞ্চল ধ্বংস, নদীদূষণ ও অবৈধ শিকার এই বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কমে যাওয়া ও কুমির, ডলফিন প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি এ বনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মুকুট, পৃথিবীর সবুজ হৃদয়ের স্পন্দন। এর প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী, প্রতিটি প্রাণ প্রকৃতির এক অসাধারণ সুরেলা কাব্যের অংশ। আমরা যদি একে সযত্নে লালন করি, তবে সুন্দরবন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য থাকবে এক অমূল্য ধন হিসেবে।

Share this news as a Photo Card