বাংলার জনপদে একটি অতি পরিচিত গ্রাম্য উপমা আছে—‘লোম বাছতে কম্বল উজাড়।’ কাজটির নিরর্থকতা ও মূর্খতা বোঝাতে এর চেয়ে ধারাল উদাহরণ আর হয় না। লোম বা পশমই কম্বলের মূল উপাদান, যা তাকে অবয়ব, স্থায়িত্ব ও পরম উষ্ণতা দেয়। এখন কেউ যদি ‘বিশুদ্ধতার’ দোহাই দিয়ে সেই পশমগুলো একটি একটি করে উপড়ে ফেলতে শুরু করেন, তবে শেষ পর্যন্ত তার হাতে কোনো ব্যবহারযোগ্য বস্তু থাকে না; থাকে কেবল ছিঁড়ে যাওয়া কিছু সুতোর কঙ্কাল।
আজ বাংলা ভাষা থেকে ‘বিদেশি’ শব্দ, বিশেষ করে আরবি, ফারসি বা উর্দু শব্দ ছেঁটে ফেলার যে অতি-শুদ্ধিবাদী প্রবণতা আমরা দেখছি, তা ঠিক এই কম্বল থেকে লোম বাছার মতোই এক আত্মঘাতী উদ্যোগ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা এই শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন, তারা হয়তো জানেনই না যে—স্বয়ং ‘বাংলা’ শব্দটাই ফারসি! এমনকি ভাষাশহীদদের স্মরণ করতে যে স্মৃতির মিনারে আমরা দাঁড়াই, সেই শহীদ মিনার-এর ‘শহীদ’ ও ‘মিনার’—উভয়ই আরবি শব্দ। ভাষার শরীর থেকে তার জীবন্ত কোষগুলো উপড়ে ফেললে ভাষা কেবল রিক্তই হয় না, বরং তা তার প্রকাশের সক্ষমতা হারিয়ে একটি জড় ও কৃত্রিম বস্তুতে পরিণত হয়।
ভাষার সংজ্ঞা ও ঐশ্বরিক অধিকার
মানুষের মনের ভাব প্রকাশের অর্থবহ শব্দসম্ভারই হলো ভাষা। এমনকি বাকপ্রতিবন্ধীদের আকার-ইঙ্গিতও ভাষার মর্যাদা পায়। এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। এক গ্রামে একবার এক বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির তালাকের বিষয় নিয়ে সালিশি বসে। লোকটি কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু তার ক্ষোভ ছিল প্রবল। তিনি পাশের খড়ের স্তূপ থেকে একটি খড় এনে সবার সামনে নাটকীয় ভঙ্গিতে সেটিকে এক, দুই ও তিন ভাগে বিভক্ত করে দেখালেন। এই ইঙ্গিতের মাধ্যমেই তিনি তার ‘তিন তালাক’ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেন এবং সমাজ তা গ্রহণ করল। অর্থাৎ, ভাব প্রকাশই ভাষার মূল লক্ষ্য।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ভাষা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এক বিরাট নিয়ামত। আল কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি প্রতিটি জাতিকে তাদের নিজস্ব ভাষায় নবী পাঠিয়েছেন যেন তারা সত্যের দাওয়াত সহজেই অনুধাবন করতে পারে (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত : ৪)। সুতরাং, মাতৃভাষা থেকে কাউকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। ১৯৪৭ সালের পর থেকে আমাদের মাতৃভাষা নিয়ে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের তমুদ্দুন মজলিশের আন্দোলন এবং সালাম-বরকতদের আত্মত্যাগ ছিল এই ঐশ্বরিক অধিকার রক্ষারই সংগ্রাম।
প্রাত্যহিক জীবনে আরবি-ফারসি
আমরা যখন আরামকেদারায় বসে খবরের কাগজে নজর বুলাই, তখন আমরা অজান্তেই আরবি-ফারসি ভাষার সমুদ্রে সাঁতার কাটি। আদালতের দিকে তাকালে দেখা যায়—‘আদালত’, ‘আইন’, ‘উকিল’, ‘ওকালতি’, ‘মক্কেল’, ‘হাকিম’, ‘হুকুম’, ‘এজাহার’, ‘বয়ান’, ‘ফরমান’, ‘ফয়সালা’—সবই আরবি। এমনকি ‘আসামি’ শব্দটিও আরবি থেকে এসেছে। আমরা যখন বলি ‘শুরু’ করব, তখন সেই শুরুটাও আরবি। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে যে আওয়াজ দিই, সেই ‘আওয়াজ’ ও ‘দরজা’ ফারসি এবং ‘সদর’ আরবি। ‘বাবা’ শব্দটি তুর্কি, ‘কাকা’ ফারসি—এভাবেই আমাদের নাড়ির সম্পর্কের নামগুলোও গড়ে উঠেছে নানা ভাষার মিলনে।
চায়ের আড্ডায় যে আরাম করে ‘নাশতা’ করি বা ‘আসর’ জমাই, সেখানে ‘নাশতা’ ও ‘আরাম’ ফারসি; আর ‘আসর’, ‘জমা’, ‘জলসা’, ‘মজলিস’—সবই আরবি। এমনকি আপনি যখন বলেন ‘আলবত’ বা ‘বিলকুল’, ঠিক তখন আপনি খাঁটি আরবি শব্দই ব্যবহার করছেন। এই যে কথায় কথায় আমরা ‘বাঙালি’ বা ‘বাংলা’ বলছি, এর ‘বাংলা’ শব্দটাই তো ফারসি! আবার বাংলা শব্দটি যে ‘বঙ্গ’ শব্দ থেকে এসেছে, সে বঙ্গ শব্দটাও ‘দ্রাবিড়’। অর্থাৎ আরবি-ফারসি বাদ দিলে বাংলা ভাষা সাবলীল গতিতে চলতেই পারবে না। ‘ফের’ ও ‘ফেরা’ আরবি এবং ‘রাস্তা’ ফারসি। এখন তো দেখছি, আরবি-ফারসি ছাড়া ‘কদম’ ফেলাই যাবে না! কী করে যাবে? ‘কদম’ শব্দটাও তো আরবি।
অন্যদিকে যারা আরবি ‘ইনসাফ’-এর পরিবর্তে ‘ন্যায়’ বলতে বলে—তারা কি জানে ‘ন্যায়’ সংস্কৃত শব্দ! ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’ বললে যারা বস্তাবন্দি করার হুমকি দেন, তারা হয়তো খেয়াল করেন না যে ‘বস্তাবন্দি’ শব্দটি নিজেই ফারসি উৎসজাত। উর্দু গান গাইতে মানা করলেও ‘গান’ শব্দটি আরবি। এমনকি আমাদের অস্তিত্বের পরিচায়ক ‘মানুষ’ (মানুস) শব্দটি আরবি থেকে বিবর্তিত। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’, শহীদদের নাম—‘সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার’—সবই তো আরবি। তাহলে কি আমরা এই ইতিহাসকেও মুছে ফেলব?
রিপোর্টারের নাম 

























