বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে একটি সুনির্দিষ্ট ও একপাক্ষিক রাজনৈতিক বয়ান স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এসব প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে বরং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য হিসেবে দলটিকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো দাবি করছে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছে। ফার্স্টপোস্টের মতো কিছু সংবাদমাধ্যম সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকার কারণে জামায়াত এখন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে দাবি তুলছে। তবে একই সময়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়লাভ করলেও ভারতীয় গণমাধ্যম এই জনসমর্থনকে প্রচার না করে বরং সেটিকে ‘র্যাডিক্যালাইজেশন’ বা ‘উগ্রবাদের বিস্তার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার মতো কিছু গণমাধ্যম জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি বিবৃতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন দলটি নির্বাচনের আগেই পরাজয় স্বীকার করে প্রশাসনকে অভিযুক্ত করছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে প্রশাসনের মধ্যে বিশেষ একটি দলের অনুসারীদের সরিয়ে শতভাগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো পুরোনো একাত্তরের প্রেক্ষাপটকেই বারবার সামনে আনছে এবং জামায়াতকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করছে। অথচ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নতুন একটি ধারার ইঙ্গিত দিলেও সেই বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই প্রচারণার আরো গভীর উদাহরণ পাওয়া যায়, যখন বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো শত্রুতার কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কেউ মারা গেলে কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এটিকে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে চিত্রিত করে। যেমন, যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যার ঘটনাকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা আনন্দবাজার এমনভাবে তুলে ধরেছিল যেন এটি একটি হিন্দু নিধনযজ্ঞের অংশ। কিন্তু বিবিসি বাংলার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে, নিহত ব্যক্তি একসময় চরমপন্থি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তার নামে একাধিক মামলাও ছিল। তা সত্ত্বেও ভারতীয় গণমাধ্যম এসব ক্ষেত্রে সরাসরি জামায়াত বা কট্টরপন্থিদের দায় চাপানোর চেষ্টা করে। এমনকি রিপাবলিক বাংলার মতো চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের বিজয়কেও ‘ইসলামী বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ভারতের দর্শকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিবিষয়ক বিশিষ্ট কূটনীতিক রিয়াজ আহমেদ মনে করেন, ভারত বর্তমানে বাংলাদেশে তার হারানো প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া। আওয়ামী লীগের পতনের পর তারা বিএনপিকে মিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হলেও, জামায়াতে ইসলামী তাদের কাছে সবসময়ই একটি ‘রেড লাইন’। তাই গণমাধ্যমের মাধ্যমে জামায়াতকে দানবীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে বিএনপি তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর (যেমন: বিবিসি বা আলজাজিরা) দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এই প্রচারণার বিপরীত একটি চিত্র পাওয়া যায়। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিষয়টিকে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে। আলজাজিরা বারবার তুলে ধরেছে যে, গত দেড় দশকে জামায়াতের ওপর যে অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন চলেছে, তার ফলে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে ভারতীয় গণমাধ্যম জামায়াতকে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার বা তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক জয়ন্ত সিনহা উল্লেখ করেন, ভারতীয় গণমাধ্যম যে ‘ফেয়ার’ নির্বাচনের কথা বলছে, তাদের সংজ্ঞায় সেখানে জামায়াতের কোনো স্থান নেই। এটি এক ধরনের ‘সিলেক্টিভ জার্নালিজম’, যেখানে ছাত্র নির্বাচনে জামায়াতের বিপুল বিজয়কে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়েছে, অথচ সেই বিজয়ই ছিল বর্তমান জনমতের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, ভারতীয় সরকারের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের মিডিয়া প্রোপাগান্ডার মধ্যে এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
কূটনৈতিক মহল লক্ষ করছে, দীর্ঘদিনের মিত্র আওয়ামী লীগের পতনের পর ভারত এখন বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাচ্ছে। দলটির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় উপস্থিতি এবং শোকবার্তায় সম্মান প্রদর্শন এই বার্তাই দেয় যে, ভারত এখন বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তবে ভারতের অলিখিত শর্ত হলো, বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। ভারতীয় গণমাধ্যম এই রাজনৈতিক ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতেই জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জামায়াতকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ ও ‘ভারতবিরোধী’ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করছে, যাতে বিএনপি তাদের থেকে দূরে থাকে এবং আন্তর্জাতিক মহল জামায়াতকে স্বীকৃতি না দেয়। মূলত জামায়াতকে একঘরে করে ফেলার এই কৌশলটি দিল্লির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি’র একটি অংশ, যেখানে তারা তাদের অপছন্দের শক্তিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে চায়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়টি সামনে এনে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে তকমা দেওয়াই এখন ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সুপরিকল্পিত প্রচারণা বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে দিল্লির পছন্দমতো রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা মাত্র।
কলকাতার এবিপি আনন্দ, রিপাবলিক বাংলার মতো কিছু গণমাধ্যম অনবরত প্রচার করছে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ একটি ‘তালিবানি’ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আলজাজিরা এবং রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে, তখন ভারতীয় গণমাধ্যম সেটিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এ ধরনের প্রচারণা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে তুলবে।
রিপোর্টারের নাম 















