মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০১:৪২ অপরাহ্ন | ৮ই নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার, ২৩শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রকৃতির রূপবদল: কুলু থেকে লাহুল-স্পিতির দুর্গম হামতা ট্রেক

  • হালনাগাদ সময় : ০১:২৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

ভারতের হিমাচল প্রদেশের হামতা পাস ট্রেক হিমালয়ের সুউচ্চ গিরিশ্রেণীর অন্যতম চিত্তাকর্ষক ও রোমাঞ্চকর অভিযান হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই প্রাচীন গিরিপথটি এক প্রান্তে সবুজে ঘেরা মনোরম কুলু উপত্যকা এবং অন্য প্রান্তে রুক্ষ, পাথুরে ও শুষ্ক শীতল মরুভূমি লাহুল-স্পিতি অঞ্চলের মধ্যে একটি অনন্য ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করেছে। মাত্র কয়েক দিনের এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথেই ট্রেকারদের সামনে হিমালয়ের প্রকৃতির বহুরূপী বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে ধরা দেয়। তবে চারপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই অভিযানটি প্রতিটি পদক্ষেপেই একজন অভিযাত্রীর শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক কঠিন পরীক্ষা নেয়।

এই ট্রেকের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় পর্যটন শহর মানালি থেকে। সেখান থেকে জোবরার ঘন পাইন ও দেবদারু বনের মধ্য দিয়ে ট্রেকারদের পৌঁছাতে হয় চিক্কা এবং পরবর্তীতে বালু কা ঘেরার সুবিশাল প্রাকৃতিক তৃণভূমিতে। এরপর থেকেই পথটি ক্রমশ বেশি দুর্গম ও চড়াই হতে থাকে। বরফে ঢাকা এবং এলোমেলো পাথুরে চড়াই পেরিয়ে ট্রেকারদের এগিয়ে যেতে হয় শিয়া গোরুর উচ্চ পার্বত্য তৃণভূমির দিকে; যেখানে প্রতিটি বাঁকে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় চারপাশের নৈসর্গিক রূপ।

হামতা পাস ট্রেকের সূচনালগ্ন বা প্রথম পর্বটি মূলত কুলু উপত্যকার অপরূপ সৌন্দর্যে সাজানো। ওক, পাইন ও দেওদার গাছের ঘন অরণ্যে ঘেরা এই অংশে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, কলকল রবে বয়ে চলা বরফগলা ছোট ছোট স্বচ্ছ জলধারা এবং কাঠ দিয়ে তৈরি সনাতনী পাহাড়ি সেতু। পাহাড়ি ফুলের সমারোহ আর হিমেল মৃদু বাতাসের পরশ নিতে নিতে অভিযাত্রীরা প্রকৃতির সবচেয়ে নিবিড় সান্নিধ্যে পৌঁছে যান।

তবে উচ্চতা যত বাড়তে থাকে, চলার পথটিও ততটাই কঠিন ও বিপজ্জনক হতে শুরু করে। হামতা পাসের মূল চূড়ার দিকে ওঠার পথে দেখা মেলে খাড়া ঢাল, পিচ্ছিল বরফের পুরু আস্তরণ এবং অত্যন্ত সরু গিরিপথ। একপর্যায়ে শ্যামল সবুজ উপত্যকা সম্পূর্ণ মিলিয়ে গিয়ে সেখানে দৃশ্যপটে জায়গা করে নেয় রুক্ষ, ন্যাড়া, পাথুরে ও বরফে ঢাকা পাহাড়। গিরিপথের সর্বোচ্চ শীর্ষে পৌঁছানোর পর চারপাশের দিগন্তজোড়া সুউচ্চ হিমালয় শৃঙ্গের রূপ যেকোনো মানুষের মন জুড়িয়ে দেয়।

এরপর হামতা পাস পেরিয়ে অভিযাত্রীরা যখন লাহুল ও স্পিতি উপত্যকার দিকে নামতে শুরু করেন, তখনই প্রকৃতির চরিত্র পুরো ১৮০ ডিগ্রি বদলে যায়। সবুজ বা বরফের বদলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুক্ষ পাথুরে পাহাড়, খাড়া ঢাল আর ধূলিময় শুষ্ক শীতল প্রান্তর। প্রথম দেখায় এই শুষ্ক মরুপ্রকৃতিকে কিছুটা নির্জীব মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে এক অপার্থিব ও নিজস্ব বুনো সৌন্দর্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রকৃতির এত তীব্র বৈসাদৃশ্য ও রূপবদল দেখার বিরল সুযোগই এই ট্রেইলকে পর্বতারোহীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

হামতা পাস কেবল চোখজুড়ানো রূপের জন্যই নয়, এর নির্মম ও কঠিন ট্রেইলের জন্যও সুপরিচিত। যতই ওপরের দিকে ওঠা হয়, বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ততই কমতে থাকে। ফলে খুব দ্রুত ক্লান্তি ভর করে এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস (এএমএস)-এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি এড়াতে ধীরে ও ছন্দ বজায় রেখে হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং নিজের শারীরিক অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখা অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের শুরুতে পথের বিভিন্ন বাঁকে বরফ জমা থাকে। কোথাও পিচ্ছিল বরফের ঢাল, কোথাও সরু পাথুরে খাঁজ, আবার কোথাও এবড়োখেবড়ো বোল্ডার পার হতে হয়। এছাড়া হিমবাহ থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড স্রোতের বরফশীতল পাহাড়ি নদী পায়ে হেঁটে পার হওয়াও এই ট্রেকের অন্যতম একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই ভালো গ্রিপযুক্ত নির্ভরযোগ্য ট্রেকিং জুতো এবং আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির পাশাপাশি হামতা পাসের ট্রেইলে রয়েছে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও বিচিত্র বন্যপ্রাণীর সমাহার। নিচু অঞ্চলের সবুজ ঘাসের মাঝে ফুটে থাকতে দেখা যায় রডোডেনড্রন, বুনো অর্কিড এবং হিমালয়ের বিখ্যাত দুর্লভ নীল পপি ফুল। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালার ঘনত্ব কমে এসে প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম ক্ষুদ্র গুল্ম ও শ্যাওলা চোখে পড়ে। আর ভাগ্য সহায় হলে পাথুরে ঢালে চড়ে বেড়ানো হিমালয়ান শিয়াল, মারমট এবং নীল ভেড়া বা ভরলের দেখা মেলে। মাঝে মাঝে বরফের নরম চাদরে তুষারচিতার (স্নো লেপার্ড) তাজা পদচিহ্নও নজরে পড়তে পারে। নির্জন পাহাড়ি খাঁজ চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ হিমবাহের ধারা যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে বিমুগ্ধ করে তোলে।

এই ট্রেকের সবচেয়ে বড় ও অবিস্মরণীয় আকর্ষণ হলো চন্দ্রতাল হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদের আক্ষরিক অর্থ ‘চাঁদের হ্রদ’। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গেও এই হ্রদটির গভীর সংযোগ রয়েছে; লোকবিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গে গমনের পথে দেবরাজ ইন্দ্রের রথ এই চন্দ্রতাল হ্রদের পাড়েই এসে নেমেছিল। চন্দ্রতালের স্ফটিক স্বচ্ছ জল দিনের আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রং বদলায়—সকালে যা থাকে গাঢ় নীল, দুপুরের দিকে তা কখনও পান্নার মতো উজ্জ্বল সবুজে রূপ নেয়। চারপাশের বরফাবৃত পর্বতের নিখুঁত প্রতিবিম্ব যখন এই শান্ত হ্রদের বুকে ভেসে ওঠে, দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ট্রেকিংয়ের পর সেই রূপ চোখের সামনে দেখা জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। জনমানবহীন নির্জনতা আর রাতের আকাশে তারায় ভরা মায়াবী ছায়াপথের নিচে তাঁবুতে রাত কাটানো ট্রেকারদের আধুনিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস—অর্থাৎ বর্ষার মৌসুমে হামতা পাসের সবুজ উপত্যকাগুলো ফুলে ফুলে সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং জলধারাগুলো পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। তবে এই সময়ে একটানা বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পিচ্ছিল ট্রেইল এবং রাতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পরিবেশ এই অভিযানকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই এই ট্রেকিংয়ে বের হওয়ার আগে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইডের সার্বক্ষণিক সহায়তা নেওয়া আবশ্যক। যারা হিমালয়ের বুক চিরে একই যাত্রায় সবুজ বনভূমি, তুষারাবৃত চূড়া এবং শুষ্ক শীতল মরুভূমির বিস্ময়কর মেলবন্ধন নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে চান, তাঁদের জন্য হামতা পাস হতে পারে এক আজীবন মনে রাখার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়ির বাইরে এসে ভক্তদের নিরাশ করলেন না রজনীকান্ত

08 November 2026

কে এই মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ সামিরা খান মাহি?

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রকৃতির রূপবদল: কুলু থেকে লাহুল-স্পিতির দুর্গম হামতা ট্রেক

হালনাগাদ সময় : ০১:২৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

ভারতের হিমাচল প্রদেশের হামতা পাস ট্রেক হিমালয়ের সুউচ্চ গিরিশ্রেণীর অন্যতম চিত্তাকর্ষক ও রোমাঞ্চকর অভিযান হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই প্রাচীন গিরিপথটি এক প্রান্তে সবুজে ঘেরা মনোরম কুলু উপত্যকা এবং অন্য প্রান্তে রুক্ষ, পাথুরে ও শুষ্ক শীতল মরুভূমি লাহুল-স্পিতি অঞ্চলের মধ্যে একটি অনন্য ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করেছে। মাত্র কয়েক দিনের এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথেই ট্রেকারদের সামনে হিমালয়ের প্রকৃতির বহুরূপী বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে ধরা দেয়। তবে চারপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই অভিযানটি প্রতিটি পদক্ষেপেই একজন অভিযাত্রীর শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক কঠিন পরীক্ষা নেয়।

এই ট্রেকের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় পর্যটন শহর মানালি থেকে। সেখান থেকে জোবরার ঘন পাইন ও দেবদারু বনের মধ্য দিয়ে ট্রেকারদের পৌঁছাতে হয় চিক্কা এবং পরবর্তীতে বালু কা ঘেরার সুবিশাল প্রাকৃতিক তৃণভূমিতে। এরপর থেকেই পথটি ক্রমশ বেশি দুর্গম ও চড়াই হতে থাকে। বরফে ঢাকা এবং এলোমেলো পাথুরে চড়াই পেরিয়ে ট্রেকারদের এগিয়ে যেতে হয় শিয়া গোরুর উচ্চ পার্বত্য তৃণভূমির দিকে; যেখানে প্রতিটি বাঁকে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় চারপাশের নৈসর্গিক রূপ।

হামতা পাস ট্রেকের সূচনালগ্ন বা প্রথম পর্বটি মূলত কুলু উপত্যকার অপরূপ সৌন্দর্যে সাজানো। ওক, পাইন ও দেওদার গাছের ঘন অরণ্যে ঘেরা এই অংশে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, কলকল রবে বয়ে চলা বরফগলা ছোট ছোট স্বচ্ছ জলধারা এবং কাঠ দিয়ে তৈরি সনাতনী পাহাড়ি সেতু। পাহাড়ি ফুলের সমারোহ আর হিমেল মৃদু বাতাসের পরশ নিতে নিতে অভিযাত্রীরা প্রকৃতির সবচেয়ে নিবিড় সান্নিধ্যে পৌঁছে যান।

তবে উচ্চতা যত বাড়তে থাকে, চলার পথটিও ততটাই কঠিন ও বিপজ্জনক হতে শুরু করে। হামতা পাসের মূল চূড়ার দিকে ওঠার পথে দেখা মেলে খাড়া ঢাল, পিচ্ছিল বরফের পুরু আস্তরণ এবং অত্যন্ত সরু গিরিপথ। একপর্যায়ে শ্যামল সবুজ উপত্যকা সম্পূর্ণ মিলিয়ে গিয়ে সেখানে দৃশ্যপটে জায়গা করে নেয় রুক্ষ, ন্যাড়া, পাথুরে ও বরফে ঢাকা পাহাড়। গিরিপথের সর্বোচ্চ শীর্ষে পৌঁছানোর পর চারপাশের দিগন্তজোড়া সুউচ্চ হিমালয় শৃঙ্গের রূপ যেকোনো মানুষের মন জুড়িয়ে দেয়।

এরপর হামতা পাস পেরিয়ে অভিযাত্রীরা যখন লাহুল ও স্পিতি উপত্যকার দিকে নামতে শুরু করেন, তখনই প্রকৃতির চরিত্র পুরো ১৮০ ডিগ্রি বদলে যায়। সবুজ বা বরফের বদলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুক্ষ পাথুরে পাহাড়, খাড়া ঢাল আর ধূলিময় শুষ্ক শীতল প্রান্তর। প্রথম দেখায় এই শুষ্ক মরুপ্রকৃতিকে কিছুটা নির্জীব মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে এক অপার্থিব ও নিজস্ব বুনো সৌন্দর্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রকৃতির এত তীব্র বৈসাদৃশ্য ও রূপবদল দেখার বিরল সুযোগই এই ট্রেইলকে পর্বতারোহীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

হামতা পাস কেবল চোখজুড়ানো রূপের জন্যই নয়, এর নির্মম ও কঠিন ট্রেইলের জন্যও সুপরিচিত। যতই ওপরের দিকে ওঠা হয়, বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ততই কমতে থাকে। ফলে খুব দ্রুত ক্লান্তি ভর করে এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস (এএমএস)-এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি এড়াতে ধীরে ও ছন্দ বজায় রেখে হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং নিজের শারীরিক অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখা অপরিহার্য। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের শুরুতে পথের বিভিন্ন বাঁকে বরফ জমা থাকে। কোথাও পিচ্ছিল বরফের ঢাল, কোথাও সরু পাথুরে খাঁজ, আবার কোথাও এবড়োখেবড়ো বোল্ডার পার হতে হয়। এছাড়া হিমবাহ থেকে নেমে আসা প্রচণ্ড স্রোতের বরফশীতল পাহাড়ি নদী পায়ে হেঁটে পার হওয়াও এই ট্রেকের অন্যতম একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই ভালো গ্রিপযুক্ত নির্ভরযোগ্য ট্রেকিং জুতো এবং আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির পাশাপাশি হামতা পাসের ট্রেইলে রয়েছে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও বিচিত্র বন্যপ্রাণীর সমাহার। নিচু অঞ্চলের সবুজ ঘাসের মাঝে ফুটে থাকতে দেখা যায় রডোডেনড্রন, বুনো অর্কিড এবং হিমালয়ের বিখ্যাত দুর্লভ নীল পপি ফুল। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালার ঘনত্ব কমে এসে প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম ক্ষুদ্র গুল্ম ও শ্যাওলা চোখে পড়ে। আর ভাগ্য সহায় হলে পাথুরে ঢালে চড়ে বেড়ানো হিমালয়ান শিয়াল, মারমট এবং নীল ভেড়া বা ভরলের দেখা মেলে। মাঝে মাঝে বরফের নরম চাদরে তুষারচিতার (স্নো লেপার্ড) তাজা পদচিহ্নও নজরে পড়তে পারে। নির্জন পাহাড়ি খাঁজ চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ হিমবাহের ধারা যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে বিমুগ্ধ করে তোলে।

এই ট্রেকের সবচেয়ে বড় ও অবিস্মরণীয় আকর্ষণ হলো চন্দ্রতাল হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই হ্রদের আক্ষরিক অর্থ ‘চাঁদের হ্রদ’। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গেও এই হ্রদটির গভীর সংযোগ রয়েছে; লোকবিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গে গমনের পথে দেবরাজ ইন্দ্রের রথ এই চন্দ্রতাল হ্রদের পাড়েই এসে নেমেছিল। চন্দ্রতালের স্ফটিক স্বচ্ছ জল দিনের আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রং বদলায়—সকালে যা থাকে গাঢ় নীল, দুপুরের দিকে তা কখনও পান্নার মতো উজ্জ্বল সবুজে রূপ নেয়। চারপাশের বরফাবৃত পর্বতের নিখুঁত প্রতিবিম্ব যখন এই শান্ত হ্রদের বুকে ভেসে ওঠে, দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ট্রেকিংয়ের পর সেই রূপ চোখের সামনে দেখা জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়। জনমানবহীন নির্জনতা আর রাতের আকাশে তারায় ভরা মায়াবী ছায়াপথের নিচে তাঁবুতে রাত কাটানো ট্রেকারদের আধুনিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস—অর্থাৎ বর্ষার মৌসুমে হামতা পাসের সবুজ উপত্যকাগুলো ফুলে ফুলে সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং জলধারাগুলো পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। তবে এই সময়ে একটানা বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পিচ্ছিল ট্রেইল এবং রাতের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পরিবেশ এই অভিযানকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই এই ট্রেকিংয়ে বের হওয়ার আগে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইডের সার্বক্ষণিক সহায়তা নেওয়া আবশ্যক। যারা হিমালয়ের বুক চিরে একই যাত্রায় সবুজ বনভূমি, তুষারাবৃত চূড়া এবং শুষ্ক শীতল মরুভূমির বিস্ময়কর মেলবন্ধন নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে চান, তাঁদের জন্য হামতা পাস হতে পারে এক আজীবন মনে রাখার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

Share this news as a Photo Card