দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একের পর এক বিদেশ সফরের দেশ নির্বাচনে স্পষ্ট রূপ নিয়েছে একটি বাস্তববাদী ও কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি। তথাকথিত দিল্লি-বেইজিং বা ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের দ্বিদলীয় বা বাইনারি বলয়ে না জড়িয়ে তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন খাঁটি ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলনীতিকে। মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে শুরু করে চলমান জাপান সফর এবং পরবর্তীতে তুরস্ক ও সৌদি আরব যাত্রার পরিকল্পনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং যুবসমাজের জন্য বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণকেই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক হাব মালয়েশিয়া এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরাশক্তি চীনকে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি বড় দুই আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে তৃতীয় দেশ হিসেবে প্রথমে কুয়ালালামপুর সফর বেছে নেওয়া ছিল সতর্ক ভারসাম্য ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। মালয়েশিয়া সফরে মূল জোর দেওয়া হয়েছিল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল অর্থনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, পেশাজীবীদের সুযোগ ও প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষার ওপর। একই সঙ্গে আসিয়ান জোটের ‘সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়া এবং বিশ্বের বৃহত্তম মুক্তবাণিজ্য জোট আরসিইপি (RCEP)-তে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বার্তা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।
মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি চার দিনের সফরে চীনে গিয়ে বাণিজ্য ও বড় অবকাঠামো অর্থায়নের বাস্তব অর্জন নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণে প্রায় ৩৩৬ মিলিয়ন ডলারের রেয়াতি ঋণ চুক্তি, চট্টগ্রামে চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত করাসহ মোট ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।
একই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নত অর্থনীতি জাপানকে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চলমান চার দিনের সফরে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় কোস্টগার্ডের জন্য টহল জাহাজ অনুদান, বিগ-বি উদ্যোগকে সম্প্রসারণ এবং আগামী পাঁচ বছরে জাপানের পক্ষ থেকে ১ লাখ কোটি ইয়েন (৬.৬ বিলিয়ন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে—মালয়েশিয়া থেকে শ্রমবাজার, চীন থেকে বাণিজ্য ও তিস্তা কূটনীতি এবং জাপান থেকে মেগা বিনিয়োগ—এই তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর ভর করেই নিজের কূটনৈতিক রোডম্যাপ সাজিয়েছেন তিনি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, অর্থনৈতিক কূটনীতির এই ধারা বজায় রেখে জাপানের পর প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে তুরস্ক। সেখানে আন্তালিয়ায় আসন্ন কপ-৩১ (COP-31) জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে, যার কেন্দ্রে থাকবে ‘জলবায়ু অর্থনীতি’ এবং চট্টগ্রামের প্রতিরক্ষা শিল্প পার্কে তুরস্কের বড় ধরনের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এরপর সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মূল এজেন্ডা হবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগ নিশ্চয়তা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার কোনো বাইরের নির্দেশ বা প্রভাবে নয়, বরং জনগণের ম্যান্ডেট ও বাস্তব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, রাজনৈতিক বা আদর্শিক আবেগের চেয়ে দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা ও যুব কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দেওয়াই একটি কার্যকর ও পরিপক্ব পররাষ্ট্রনীতির আসল পরিচয়।

























