‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’—এই আনুষ্ঠানিক স্লোগান নিয়ে পরিচালিত হলেও দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের মৌলিক চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৫) দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় অন্তত ১ হাজার ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই কারা হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৫১ জন বন্দি। যাদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার পথে অথবা নেওয়ার পর। এমন পরিস্থিতিতে কারাগারের সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মানবাধিকার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, কারাগারগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসাসেবা কেবল ব্যাহতই নয়, বরং তা ‘নেই বললেই চলে’।
কারা অধিদপ্তরের সংরক্ষিত আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মারা যাওয়া ১ হাজার ৪১৩ জনের মধ্যে কারা অভ্যন্তরীণ হাসপাতালে মারা গেছেন মাত্র ৩ জন (২০২১ সালে)। বাকি ৯০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বাইরের হাসপাতালে এবং ৪৯৬ জন বন্দি মারা গেছেন কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে। এছাড়া ৭ জন বন্দি আত্মহত্যা করেছেন। বছরওয়ারি হিসাবে ২০২১ সালে ৩০১ জন, ২০২২ সালে ২২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩৭৭ জন, ২০২৪ সালে ৩২১ জন এবং ২০২৫ সালে ১৮৮ জন বন্দি মারা যান। চিকিৎসকদের মতে, এসব মৃত্যুর সিংহভাগই ঘটেছে অসুস্থতাজনিত কারণে, যার মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারা হেফাজতে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের তুলনায় বিচারাধীন বন্দি বা হাজতিদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে গণমাধ্যমে আসা ১০২ জন বন্দিমৃত্যুর খতিয়ানে ৬০ জনই ছিলেন বিচারাধীন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগারে প্রবেশের সময় অসুস্থ বা দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত বন্দিদের চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকে না। ইনসুলিন বা নিয়মিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়ায় অনেকে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যান।
সরেজমিনে চিকিৎসা অবহেলার করুণ চিত্র উঠে এসেছে মালিবাগের এটিএম বুথের নিরাপত্তারক্ষী রফিকুল ইসলামের (৫৯) মৃত্যুর ঘটনায়। কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় তীব্র বুকে ব্যথা নিয়ে হার্ট অ্যাটাক করলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। একই দিনে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে নেওয়া ১৯ বছর বয়সী বন্দি মেহেদী হাসানও হাসপাতালে মারা যান, যা নিয়ে মর্গের সামনে স্বজনদের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্বাস্থ্যসেবার এই চরম সংকটের মূলে রয়েছে প্রকট জনবল ও কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের ৭৫টি কারাগারের বিপরীতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৬২টি হলেও বর্তমানে প্রেষণে সার্বক্ষণিক কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন চিকিৎসক (একজন মানিকগঞ্জে, অন্যজন রাজশাহীতে)। বাকি কারাগারগুলোতে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা দিনে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টার জন্য গিয়ে দায়িত্ব সারেন। ফলে রাতে কোনো বন্দি গুরুতর অসুস্থ হলে অন-কল বা ফোনে কথা বলে চিকিৎসা চালাতে হয়। এছাড়া ১০১টি ডিপ্লোমা নার্সের বিপরীতে আছেন মাত্র ২৯ জন এবং ল্যাব টেকনিশিয়ান রয়েছেন মাত্র ৫ জন। এমনকি ৭৫টি কারাগারের জন্য সচল অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২১টি। ফলে আশঙ্কাজনক রোগীকে অক্সিজেন বা স্যালাইন ছাড়া পিকআপ ভ্যান বা জেল সুপারের সাধারণ গাড়িতে করে হাসপাতালে নিতে বাধ্য হচ্ছেন কারারক্ষীরা।
অন্যদিকে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কারাগারের কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য কেনা প্রায় ৯ কোটি টাকার অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন দুই যুগেও ব্যবহৃত হয়নি। চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জ ও খুলনা কারাগারের প্রায় ৪ কোটি টাকার ইসিজি, এক্স-রে ও এন্ডোস্কোপি মেশিনও বাক্সবন্দি অবস্থায় অকেজো হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে দেশে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে (অক্টোবরের হিসাবে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি)। প্রতিদিন গড়ে জামিনের তুলনায় ৩০০ জন করে বেশি বন্দি যুক্ত হচ্ছেন। অতিরিক্ত বন্দির চাপে এবং নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস অনুযায়ী ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারায় বন্দিমৃত্যু বাড়ছে। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘাটতি মেটাতে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রক্রিয়া এবং ৫৫ জন নার্স নিয়োগের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে চিকিৎসকদের জন্য স্থায়ী ক্যাডার পদ ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা চালু না হলে বন্দিদের জীবনের এই ঝুঁকি কমানো অসম্ভব।
























