দেশজুড়ে চলন্ত ট্রেনে একের পর এক পাথর ও ঢিল নিক্ষেপের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলায় সাধারণ যাত্রীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রেনের জানালার শক্ত কাচ ভেঙে ভারী পাথরের আঘাতে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছেন শিশুসহ সাধারণ যাত্রী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত রেলকর্মীরা। নিয়মিত ধ্বংস হচ্ছে রাষ্ট্রীয় রেলের মূল্যবান সম্পদ। একসময়ের সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক বাহন হিসেবে পরিচিত ট্রেনভ্রমণ এখন যাত্রীদের জন্য রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পর্যটকদের অত্যন্ত জনপ্রিয় ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পাথর হামলার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে শুরু করে কক্সবাজারের রামু রেলস্টেশন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও সমতল অংশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেনে পাথর ছুড়ছে দুর্বৃত্তরা। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত ৫০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। পাথরের সরাসরি আঘাতে যাত্রীদের দাঁত ভেঙে যাওয়া ও মুখমণ্ডলে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টির বহু ঘটনা ঘটেছে। রেল পুলিশের ধারণা, রেললাইন নির্মাণের সময় জমি হারানোর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কিংবা লাইনের খুব কাছে বসবাসকারী লোকজনের অসন্তোষ থেকে এ ধরনের নাশকতা হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় এলাকাভিত্তিক কিশোর-তরুণরা নিছক বিকৃত আনন্দের বশবর্তী হয়েও ট্রেনের দিকে পাথর ছুড়ে মারছে।
একই সংকট দেখা দিয়েছে পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া করিডোরে। নোয়াখালীগামী ‘উপকূল এক্সপ্রেস’ কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর স্টেশন পার হওয়ার সময় জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে ঢোকা পাথরের আঘাতে মহিউদ্দিন নামের এক যাত্রীর মাথা ফেটে যায়। রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, কুমিল্লা অঞ্চলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে বিগত ছয় মাসে অন্তত ৩৬টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে; যার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম মূল রুটে ঘটেছে ৩০টি। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৫ সাল ও ২০২৬ সালের প্রথম আট মাস মিলিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলপথে চলন্ত ট্রেনে প্রায় আড়াই শ পাথর হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের আশুগঞ্জ থেকে কসবা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় ৭২ কিলোমিটার অংশকে রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাথরের সরাসরি আঘাতে অঙ্গহানির মর্মান্তিক চিত্রও সামনে আসছে। গত ২৩ জুন রাতে চট্টগ্রামগামী ‘তূর্ণা এক্সপ্রেস’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহর রেলস্টেশন অতিক্রম করার সময় জানালার পাশে বসে থাকা আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাসের ডান চোখে সরাসরি একটি বড় পাথর এসে বিদ্ধ হয়। ঢাকায় এনে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকেরা তাঁর চোখটি আর রক্ষা করতে পারেননি। এর আগে চকরিয়া এলাকায় ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’-এ পাথর ছুড়লে মোহাম্মদ হিমেল নামের এক যুবকের ঠোঁট কেটে চারটি দাঁত ভেঙে যায়।
এদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। সেখানকার ২০টি জেলার প্রায় ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানকে পাথর নিক্ষেপের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, নাটোরের আবদুলপুর, সিরাজগঞ্জের মনসুর আলী ও যমুনা সেতু পশ্চিম স্টেশন, পাবনার মুলাডুলি ও ভাঙ্গুড়া, পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁওয়ের কিসমত-রুহিয়া এবং বগুড়ার ভেলুরপাড়াসহ ১৫টি পয়েন্টে প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটছে। পাবনার ঢালারচর-রাজশাহী রেলপথে সেপ্টেম্বর মাসেই দুবলিয়া ও তাঁতিবন্ধ স্টেশনের মাঝে ২০ বারের বেশি পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পশ্চিমাঞ্চল রেলে গত এক বছরে ৭৪টি হামলায় ৬৩টি ট্রেনের কাচ ভেঙে গেছে এবং সাধারণ যাত্রী ও চালক মিলিয়ে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন।
রাজধানীর সন্নিকটে গাজীপুরের টঙ্গী জংশন এলাকাতেও যাত্রীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে। স্টেশনের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকা এবং পর্যাপ্ত পুলিশি নজরদারির অভাবে বনমালা রেলগেট, তিস্তার গেট ও মরকুন আউটার সিগন্যালে ট্রেন গতি কমালেই ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্র পাথর ছুড়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যাত্রীদের স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একইভাবে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনসংলগ্ন বস্তি ও কলোনির মাদকাসক্ত তরুণরা ঘাপটি মেরে বসে থেকে নিয়মিত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে যাত্রীদের আহত করছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে এবং এই অপকর্মে তরুণদের সম্পৃক্ততা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একের পর এক এমন প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটলেও কার্যকর দৃষ্টান্তমূলক শা

























