খোলাবাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র অস্থিরতা ও লাগামহীন মূল্যের মাঝেই আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতা—সব পক্ষই তাদের কমিশন প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে। বাজারে বিরাজমান চরম অরাজকতার মধ্যেই জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আগামী ২৯ অক্টোবর এই কমিশন বৃদ্ধির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক গণশুনানি করতে যাচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আমদানিকারকরা প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে বিদ্যমান ২০০ টাকা কমিশন বাড়িয়ে অস্বাভাবিক হারে পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে; সবচেয়ে কম দাবি জানিয়েছে মেঘনা গ্রুপ, যা সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ টাকা। অন্যদিকে পরিবেশকেরা তাদের ৫০ টাকার কমিশন বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন জমা দিয়েছে।
পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখেই বিইআরসির এই তড়িঘড়ি গণশুনানির আয়োজন নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ অক্টোবর কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। বাজারে জোর গুঞ্জন রয়েছে, কমিশন বাড়ানোর সরকারের মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং নতুন এই বর্ধিত কমিশন আগামী নভেম্বর মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর আগেও বিভিন্ন সময় সরবরাহ সংকট তৈরি করে ভোক্তা ও সরকারকে জিম্মি করে কমিশন বাড়িয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী আমদানিকারক চক্র।
বিগত বছরগুলোতে একাধিকবার বাজার সংকটের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা শুল্ক ছাড়, আমদানির ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি এবং ঋণে এলসি খোলার বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। এমনকি গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি টন এলপিজির জাহাজ ভাড়াও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার পরও খুচরা বাজারে এলপিজির দাম বাগে আনা যায়নি।
গত সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দেশে নতুন করে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। গৃহস্থালির রান্নায় বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানির সরকারি নির্ধারিত দর কার্যকর হচ্ছে না। চলতি অক্টোবর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম একলাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। অথচ মাঠপর্যায়ে সাধারণ ভোক্তাদের সিলিন্ডারপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
২০২১ সালের ১২ এপ্রিল বিইআরসি যখন প্রথমবারের মতো এলপিজির দর নির্ধারণ শুরু করে, সেদিন থেকেই আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব (LOAB) কমিশনের বিরোধিতা করে আসছিল। একপর্যায়ে আমদানি বন্ধের হুমকির মুখে বিইআরসি কমিশন ১৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৬ টাকা এবং পরে ২০০ টাকায় উন্নীত করে। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বরং নতুন কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
বিইআরসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমদানিকারকদের অনড় চাপের মুখে টনপ্রতি ১০৮ ডলারের জাহাজ ভাড়া একলাফে ২৫০ ডলার করতে হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত চাপ এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় বাধ্য হয়ে নমনীয় হতে হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
এ বিষয়ে বর্তমান লোয়াব সভাপতি আমিরুল ইসলাম জানান, যৌক্তিক মূল্যায়ন ও বাস্তবতার ভিত্তিতেই কমিশন বাড়ানো উচিত, কারণ বিদ্যমান কমিশনে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের কোরাইশি জানান, সরবরাহ সংকটের সময় কোম্পানিগুলো নিজ দায়িত্বে পরিবেশকের কাছে গ্যাস পৌঁছে দেয় না। ফলে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের লোকসান হয়। সেই কারণে পরিবহন ব্যয় সমন্বয়ের জন্য তাঁরা কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

























