হাতকড়া পরানো আসামিকে প্রকাশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ দল। নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে চলছে অতর্কিত দলবদ্ধ আক্রমণ এবং ভাঙচুর করা হচ্ছে পুলিশের সরকারি টহল গাড়ি। এমনকি রাজপথের মিছিল-বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ কিংবা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়েও ক্রমাগত হামলার মুখে পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কোথাও দাগি অপরাধীদের সশস্ত্র সহযোগী, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি, আবার কোথাও স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা সরাসরি পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে। এমনকি ইউনিফর্ম খুলে দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে থাকা পুলিশ সদস্যরাও রক্ষা পাচ্ছেন না এমন নৃশংস আক্রমণ থেকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক ঘটে চলা এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুলিশের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং অপরাধী চক্রগুলোর লাগামহীন বেপরোয়া আচরণকে নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যানের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মোট ৪৪০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। যদিও পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে এই মামলার সংখ্যা ছিল ৪৬২টি। পরিসংখ্যানের খাতায় মামলার সংখ্যা সামান্য কমলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হামলার বর্বর ধরন, প্রকাশ্য দিবালোকে আসামি ছিনতাই এবং পুলিশ সদস্যদের রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং চলতি নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি রোমহর্ষক ঘটনা সেই উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশের ওপর হামলা এখন আর ঝুঁকিপূর্ণ দুর্গম অভিযান কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মুখোমুখি বন্দুকযুদ্ধের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বরং নিয়মিত চেকপোস্টে তল্লাশি, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল, অবৈধ উচ্ছেদ কিংবা সাধারণ সংঘাত নিয়ন্ত্রণের মতো রুটিন দায়িত্বে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন। কোথাও পুলিশ সদস্যদের চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে মারধর করা হচ্ছে, আবার কোথাও হাতকড়া লাগানো অবস্থাতেই আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পুলিশের তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষা, অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করছে।
হাতকড়া পরানোর পরও আসামিকে আটকে রাখতে না পারার একাধিক দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি হয়েছে অতি সম্প্রতি। গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে প্রতারণা মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয় স্থানীয় একটি চক্র। হামলাকারীরা পুলিশের পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করে এবং তাদের আঘাতে একজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ তিন সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চার নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত ৯ জুন ঢাকার সাভারের বক্তারপুর এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রফিকুল ইসলামকে ধরতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম শামীম ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মশিউর রহমান খান। আসামির হাতে হাতকড়া পরাতেই ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একইভাবে জুলাই মাসে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় গ্রেপ্তার এক আসামিকে থানায় নেওয়ার পথে অর্ধশত ব্যক্তি পুলিশের চার সদস্যকে পিটিয়ে হাতকড়া পরা আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া গত ২ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জেও একাধিক মামলার আসামি আসির মিয়াকে হাতকড়া পরা অবস্থায় ছিনিয়ে নেয় তার স্বজনরা, যাকে পরে অবশ্য পুনরায় গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমাবেশ থেকেও সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের হঠাৎ বের করা একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে বন্দর থানার ওসিসহ অন্তত ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে।
শুধু রাজপথের দায়িত্ব নয়, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা প্রতিশোধের বশে ডেকে নিয়েও পুলিশ সদস্যদের পঙ্গু করে দেওয়ার মতো বর্বর ঘটনা ঘটছে। গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভার উত্তর মাসাবো এলাকায় মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য আবুল কালামকে একটি নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে যায় স্থানীয় মাদক কারবারিরা। সেখানে তাঁকে রড ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে দুই হাত ও পা ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি পায়ের রগ কেটে দেয় সন্ত্রাসীরা। গুরুতর সংকটাপন্ন অবস্থায় বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার কারণে তিনি আগে থেকেই মাদক সিন্ডিকেটের ধারাবাহিক হুমকি ও চাপের মুখে ছিলেন।
একইভাবে রাজপথের বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়েও পুলিশ সদস্যরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ চলাকালে বিক্ষোভকারীদের ছদ্মবেশে থাকা একটি সুযোগসন্ধানী বিশৃঙ্খলাকারী দল চারদিক থেকে দায়িত্বরত পুলিশকে ঘিরে ধরে লাঠিসোঁটা ও ইট দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এর আগে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাভারের আমিনবাজারে এক অটোরিকশা গ্যারেজ মালিককে মারধরের প্রতিবাদ করায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এছাড়া গত ৯ অক্টোবর ভোরে খুলনা মহানগরীর কলেজিয়েট স্কুলের সামনে দায়িত্ব পালন শেষে সাদা পোশাকে রিকশায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে চাপাতির এলোপাতাড়ি কোপে দুই হাত মারাত্মক জখম হয় পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলমের। এই ঘটনার পর রাতে পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে খুলনা জেলা পুলিশ একটি অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা জারি করলে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর ধারাবাহিক এসব হামলার পেছনে রয়েছে বহুমুখী কার্যকারণ। অপরাধীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অন্ধ চেষ্টা, তাৎক্ষণিকভাবে সাধারণ মানুষকে উসকে দিয়ে সংঘবদ্ধ ভিড় তৈরি, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া এবং সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিপজ্জনক মানসিকতা এর অন্যতম প্রধান কারণ। এর বাইরে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং তৎকালীন সরকারের নির্দেশে পুলিশের অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ফলে বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় যে ফাটল ধরেছিল, তাও একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে কাজ করছে। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছিল। সেই ট্রমা ও সংকট কাটিয়ে পুলিশ যখন পুনরায় শৃঙ্খলা ফেরাতে মাঠে সক্রিয় হচ্ছে, তখনই নানা মহলের অপতৎপরতার মুখে পড়ছে বাহিনীটি।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) সায়েদুর রহমান স্পষ্ট করে জানান, যেকোনো বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি নিয়ে পুলিশকে মাঠে দায়িত্ব পালন করতেই হয়। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট চক্র দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পুলিশের ওপর এসব হামলা চালাচ্ছে। তবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কোনো ছাড় দিচ্ছে না; জড়িতদের শনাক্ত করে নিয়মিত মামলা ও আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জননিরাপত্তা রক্ষা করতে পুলিশকে দৃঢ় অবস্থানে থাকতে হবে, তবে সেই দৃঢ়তা যেন কখনোই নিপীড়নে রূপ না নেয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর ও আপসহীন থাকবে, কিন্তু কোনোভাবেই অমানবিক বা নির্মম আচরণ করবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পুলিশের ওপর এভাবে বারবার হামলা ও আসামি ছিনতাই কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়, বরং সামগ্রিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতার ওপর চরম আঘাত। অপরাধীরা যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানায়, তখন সাধারণ নাগরিকদের ভেতর গভীর নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে এনে সাধারণ জনগণের সঙ্গে নষ্ট হওয়া আস্থার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আইনের শাসন টেকসই করা সম্ভব নয়।
























