টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে হু হু করে বাড়ছে পানির পরিমাণ। হ্রদের পানির ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে এবং তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হচ্ছে। একই সময়ে রাঙামাটি শহরের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুর পাটাতনের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দর্শনার্থীদের জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে সেতুটিতে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ ও চলাচল সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং হ্রদের পানির উচ্চতা সহনীয় মাত্রায় রাখতে শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত সোয়া আটটার দিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট একযোগে খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কপাট ৬ ইঞ্চি করে উঠিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলের কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানি অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করেছে। এর ফলে তীরবর্তী জনপদগুলোতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বাঘাইছড়ির পাশাপাশি রাঙামাটি সদর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও পানি ঢুকে পড়েছে। নিচু এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও মানুষের বসতভিটা প্লাবিত হওয়ায় স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনে চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে।
বাঘাইছড়ি পৌরসভার আওতাধীন বটতলী, এফ ব্লক, পুরাতন মারিশ্যা, মাস্টারপাড়া, মাদ্রাসাপাড়া, লাইল্যাঘোনা, উলুছড়ি, বাঘাইহাট, পশ্চিম মুসলিম ব্লক ও মধ্যমপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকে রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি নিমজ্জিত হয়েছে। স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কয়েকটি পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানীয় বিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান জানান, নিচু এলাকাগুলো ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে এবং পুরো পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে বাঘাইছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল মাবুদ উল্লেখ করেন, পানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেওয়া শুরু করেছে।
কাপ্তাই হ্রদের জলস্তর বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় উজান ও ভাটির সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৬টি গেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শনিবার দুপুর ২টার পরিমাপে হ্রদের পানির উচ্চতা ১০৫ দশমিক ৬৪ ফুট এমএসএল (মিন সি লেভেল) রেকর্ড করা হয়েছিল, যেখানে হ্রদটির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, হ্রদের পানির বৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হওয়ায় পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই স্পিলওয়ের কপাটগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, বৃষ্টিপাতের ধারা, উজান থেকে পানির প্রবাহ এবং হ্রদের সার্বিক উচ্চতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পানি নিষ্কাশনের পরিমাণও সমন্বয় করা হতে পারে। বর্তমানে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট একযোগে চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এর সাথে স্পিলওয়ের ১৬টি জলকপাট দিয়ে অতিরিক্ত আরও প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি নির্গত হচ্ছে।
কাপ্তাই হ্রদে পানি উপচে পড়ার কারণে রাঙামাটির মূল পর্যটন কেন্দ্র ঝুলন্ত সেতুর ওপর পানি উঠে যাওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে চলাচল বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হ্রদের পানি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত সেতুতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ থাকবে। হ্রদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে তীরবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নাঞ্চলে বসবাসরত বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


























