বাংলাদেশে বিগত দুই দশক ধরে অলিম্পিয়াড আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। গণিত থেকে শুরু করে বিজ্ঞান কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে আজ প্রায় দুই ডজনেরও বেশি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে। তবে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে গিয়ে বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে চোখে পড়ছে—তা হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইস বা স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা ও তীব্র মোহ। আজকের যুগে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও টেলিভিশনের পর্দার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। পড়াশোনা থেকে বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল মাধ্যমের অতিব্যবহার শিশুদের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি ডেকে এনেছে মারাত্মক এক স্বাস্থ্য ও মানসিক সংকট।
গবেষকদের মতে, শিশুরা কেন এত বেশি স্ক্রিনমুখী হচ্ছে এবং কী ধরণের কনটেন্টে সময় দিচ্ছে, তা আজ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত সুধীর কুমার মুপ্পালার এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি তাদের মানসিক বিকাশকে স্থবির করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের রঙিন দৃশ্য, দ্রুত পরিবর্তনশীল অ্যানিমেশন ও চটুল শব্দ শিশুদের মস্তিষ্কে কৃত্রিম ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যার ফলে তারা বারবার সেই স্ক্রিনে ফিরে যাওয়ার এক ধরনের অপ্রতিরোধ্য তাড়না অনুভব করে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা তো বটেই, খোদ ঢাকা শহরের স্কুলগামী শিশুদের ওপর পরিচালিত আইসিডিডিআর,বি-র এক সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এই চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন ও তাঁর গবেষক দল ঢাকার ছয়টি বিদ্যালয়ের ৪২১ জন শিশুর ওপর ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৩ শতাংশই প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, বিনোদনের জন্য এই বয়সী শিশুদের কোনোভাবেই দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম থাকা উচিত নয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী শিশুরা দৈনিক গড়ে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন বা টিভির পেছনে ব্যয় করছে, যা তাদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
অতিরিক্ত স্ক্রিনের ব্যবহারের ফলে শিশুদের আচরণগত ও শারীরিক সমস্যার গভীর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষক প্রশান্ত ভি কারিয়া, রিনাম এন দোশি এবং অমিত এস জৈন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চারজন শিশুর মধ্যে একজন নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা ও দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথায় ভুগছে। এছাড়া প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা (হাইপারঅ্যাক্টিভিটি) এবং বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। রাতে ডিভাইসের ক্ষতিকর নীল আলো শিশুদের স্বাভাবিক ঘুম চক্র নষ্ট করে তাদের দিনভর ক্লান্ত রাখে।
প্রয়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক ফাতিমা মেঘলা বিষয়টিকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, তাদের কাছে থেরাপির জন্য আসা শিশুদের একটি বড় অংশের মধ্যেই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে অটিজম-সদৃশ লক্ষণ কিংবা দেরিতে কথা বলার (স্পিচ ডিলে) সমস্যা দেখা দিচ্ছে। স্ক্রিনের দ্রুত ফ্ল্যাশিং লাইট শিশুদের মনঃসংযোগের পরিধি এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে তারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সাধারণ নির্দেশনা বুঝতেও হিমশিম খাচ্ছে।
একইভাবে ভাষিক ও মননশীল বিকাশে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, নিথর স্ক্রিনের যান্ত্রিক ও অগভীর ভাষা শিশুদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শব্দচয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বই পড়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হারিয়ে শিশুরা আজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের অধ্যাপক ড. হাকিম আরিফের মতে, প্রযুক্তি শিশুর মুখের ভাব ও আবেগীয় অভিব্যক্তি বোঝার ক্ষমতা ভোঁতা করে দিচ্ছে। মা-বাবার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন কমে গিয়ে ডিভাইসের সঙ্গে একমুখী যোগাযোগের ফলে শিশুরা বাস্তব সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বা ভাব বিনিময়ের দক্ষতা হারিয়ে এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
এদিকে বর্তমান কনটেন্ট ইকোসিস্টেমের আগ্রাসী রূপ তুলে ধরে অনলাইন কনটেন্ট বিশ্লেষক নুরুন্নবী চৌধুরী হাছিব জানান, সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে ভিউ ও এনগেজমেন্ট বাড়াতে শিশুদের মস্তিষ্কে অতিরিক্ত উদ্দীপনা তৈরি হয়। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত এসব প্ল্যাটফর্মের কঠোর জবাবদিহিতা ও বয়সোপযোগী কনটেন্ট নিশ্চিত করা।
এই গুরুতর সংকট থেকে উত্তরণে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে একটি সুষম নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল রুটিন তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ মনে করেন, শিশুদের জন্য সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টানা অত্যন্ত জরুরি। ঘরের বাইরে খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, বিতর্ক ও পাঠাভ্যাসে শিশুদের সম্পৃক্ত করতে হবে। চোখের সুরক্ষায় প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি।
শিশুদের এই স্ক্রিন আসক্তি আজ আর কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা, সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, প্রাণবন্ত ও স্ক্রিনমুক্ত শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।


























