মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
১০:০১ পূর্বাহ্ন | ২৯শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

ইসলামি ব্যাংকিংকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে সুশাসন ও সুকুক অপরিহার্য: গভর্নর

  • হালনাগাদ সময় : ০৯:৩৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

ইসলামি ব্যাংকিংকে নিছক ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও শরীয়াহভিত্তিক সুকুক বাজার অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই খাতে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এসব কথা বলেন। সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ যৌথভাবে এই দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের এক-চতুর্থাংশের বেশি অংশ শরীয়াহভিত্তিক হলেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এখনও সীমিত। ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় শরীয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক বাজার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে একদিকে সরকারের অর্থায়ন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি পাবে এবং পুরো খাত আরও স্থিতিশীল হবে।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নীতিগত সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘নীতিগতভাবে ইসলামি ব্যাংকিং সবচেয়ে নিরাপদ ঋণব্যবস্থা হওয়ার কথা। কারণ এটি সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই নীতির সঠিক প্রয়োগ হয়নি। কিছু গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে অনিয়ম হয়েছে, যার ফলে গ্রাহক ও আমানতকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, এসব অনিয়মের দায় শুধু একটি পক্ষের নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, শরীয়াহ বোর্ড এবং আমানতকারীরা সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমানতকারীরাও তাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গভর্নর জানান, ইসলামি ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং দেশের বৃহত্তম ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি বড় ও শক্তিশালী ইসলামি ব্যাংক গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, যদিও ইসলামি ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমানতকারীদের ভালো মুনাফা দিতে সক্ষম, তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ খাত থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের সুযোগ নিয়েছে।

আশার কথা শুনিয়ে গভর্নর বলেন, গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আমানত এসেছে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তার অর্থও ফেরত দিয়েছে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে একটি নতুন ইসলামি ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।

শরীয়াহ বোর্ডের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে গভর্নর বলেন, ‘শরীয়াহ বোর্ডকে শক্তিশালী ও সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। বোর্ডের সদস্যদের চাকরির ভয় করলে চলবে না।’ তিনি বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, জোর করে বিক্রি করায় দেশের বন্ড বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তবে সরকারকে নতুন করে ইসলামি সুকুক বন্ড বাজারে আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলাদেশে আর কোনো আর্থিক লুটতন্ত্র ফেরত আসতে দেওয়া হবে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি একাডেমিশিয়ানসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’ তিনি মন্তব্য করেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামি ব্যাংকিং খাতকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু

28 October 2026

যাত্রাবাড়ীতে ৫ লাখ ইয়াবা জব্দ, গুলশানে মদ-বিয়ার উদ্ধারসহ বিদেশে পাচারকালে ১২ নারী উদ্ধার

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

ইসলামি ব্যাংকিংকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে সুশাসন ও সুকুক অপরিহার্য: গভর্নর

হালনাগাদ সময় : ০৯:৩৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

ইসলামি ব্যাংকিংকে নিছক ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও শরীয়াহভিত্তিক সুকুক বাজার অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই খাতে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট ঠেকাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এসব কথা বলেন। সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ যৌথভাবে এই দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের এক-চতুর্থাংশের বেশি অংশ শরীয়াহভিত্তিক হলেও ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এখনও সীমিত। ফলে তারল্য ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় শরীয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক বাজার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে একদিকে সরকারের অর্থায়ন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি পাবে এবং পুরো খাত আরও স্থিতিশীল হবে।

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নীতিগত সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘নীতিগতভাবে ইসলামি ব্যাংকিং সবচেয়ে নিরাপদ ঋণব্যবস্থা হওয়ার কথা। কারণ এটি সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই নীতির সঠিক প্রয়োগ হয়নি। কিছু গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে অনিয়ম হয়েছে, যার ফলে গ্রাহক ও আমানতকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, এসব অনিয়মের দায় শুধু একটি পক্ষের নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, শরীয়াহ বোর্ড এবং আমানতকারীরা সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমানতকারীরাও তাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গভর্নর জানান, ইসলামি ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং দেশের বৃহত্তম ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি বড় ও শক্তিশালী ইসলামি ব্যাংক গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, যদিও ইসলামি ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমানতকারীদের ভালো মুনাফা দিতে সক্ষম, তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ খাত থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের সুযোগ নিয়েছে।

আশার কথা শুনিয়ে গভর্নর বলেন, গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আমানত এসেছে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তার অর্থও ফেরত দিয়েছে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে একটি নতুন ইসলামি ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।

শরীয়াহ বোর্ডের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে গভর্নর বলেন, ‘শরীয়াহ বোর্ডকে শক্তিশালী ও সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। বোর্ডের সদস্যদের চাকরির ভয় করলে চলবে না।’ তিনি বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, জোর করে বিক্রি করায় দেশের বন্ড বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তবে সরকারকে নতুন করে ইসলামি সুকুক বন্ড বাজারে আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলাদেশে আর কোনো আর্থিক লুটতন্ত্র ফেরত আসতে দেওয়া হবে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি একাডেমিশিয়ানসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’ তিনি মন্তব্য করেন, বিশ্বব্যাপী ইসলামি ব্যাংকিং খাতকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share this news as a Photo Card