পাকিস্তানি ড্রামা ‘দার-ই-নিজাত’-এর কেন্দ্রীয় নায়ক আবু বকর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দর্শক মহলের তুমুল আলোচনার কেন্দ্রে এবং অনেক নারী দর্শকের ক্রাশে পরিণত হয়েছেন। এই নাটকের সাফল্যের পর থেকেই ফেসবুকে বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে নানা মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে; কেউ লিখছেন, ‘আবু বকরের মতো স্বামীই তো চাই!’ আবার কেউ বলছেন, ‘জীবনসঙ্গী হলে হতে হবে আবু বকরের মতো।’ এমনকি অনেকেই বেশ মজার ছলে মন্তব্য করছেন যে, ‘বাস্তবে আবু বকর নামে কোনো সাধারণ মানুষ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে হয়তো অনেকেই তা গ্রহণ করতেন না, অথচ পর্দার এই আবু বকরের প্রেমে পড়তে তাঁদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই!’ এই পুরো বিষয়টি নিছক বিনোদন কিংবা সাময়িক মুগ্ধতার বৃত্তে আটকে নেই; বরং এর মধ্য দিয়ে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নিজস্ব প্রত্যাশা এবং ভালোবাসার সংজ্ঞায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পর্দায় প্রদর্শিত কোনো কাল্পনিক চরিত্রের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে তাকে নিজের জীবনের আদর্শ সঙ্গী বা জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করার এই প্রবণতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। পাকিস্তানি ড্রামা ছাড়াও কোরিয়ান, তুর্কি কিংবা জাপানি সিরিজের বিভিন্ন জনপ্রিয় চরিত্র নিয়েও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের মধ্যে এমন তীব্র মুগ্ধতা ও ভালোলাগা প্রকাশ পেতে দেখা যায়।
তবে মৌলিক প্রশ্ন হলো, পর্দায় ফুটিয়ে তোলা ভালোবাসার এই রূপ যখন বাস্তব সম্পর্কের মূল মানদণ্ড বা মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ঠিক কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়? আমরা কি অজান্তেই নিজের বাস্তব জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এসব কাল্পনিক চরিত্রের তুলনা করতে শুরু করি? কিংবা বাস্তব সম্পর্কের স্বাভাবিক ও সহজাত সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিতে না পেরে পর্দায় দেখানো নিখুঁত ও রূপকথার মতো ভালোবাসার প্রত্যাশা করতে শুরু করি? উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’-এর আবু বকরকে নিয়ে আলোচনার ধরনগুলো লক্ষ করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয় যে, এই ড্রামার নায়ক আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করা শেহরিয়ার মুনাওয়ার নিজের অভিনয়প্রতিভাকে ছাপিয়ে এক আদর্শ স্বামীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। তাঁর নারীভক্তরা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাঁর বিভিন্ন আচরণ ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলছেন। বিশেষ করে রাগের মুহূর্তগুলোতে নিজের মেজাজ বা ক্ষোভ সংযত রাখা, স্ত্রীর আবেগ ও অনুভূতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, পরিবারের প্রতি নিজের দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কঠিন সময়েও চরম ধৈর্য ধরে কথা বলার মতো চমৎকার গুণগুলো তাঁকে অসংখ্য দর্শকের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানি নাটকের এই ধারায় পুরুষ চরিত্রগুলোর জনপ্রিয়তা অর্জনের সূচনা কিন্তু একা আবু বকরকে দিয়ে শুরু হয়নি। যখনই কোনো নাটকের প্রধান নায়ক চরিত্রটি দর্শকের মনের গভীরে দাগ কাটে, তখনই সেই চরিত্রের মতো জীবনসঙ্গী পাওয়ার আকুতি প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে দেখা যায় অনেককে। ঠিক যেমন পাকিস্তানি নাটক ‘হামসাফার’-এর আশর কিংবা ‘কাভি ম্যায় কাভি তুম’-এর মুস্তাফার মতো জনপ্রিয় চরিত্রগুলো নিয়েও দর্শকেরা সম্পর্কের আচরণ, আবেগীয় গভীরতা এবং ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে থাকেন। এই তালিকায় আরও রয়েছে ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আলোচিত সিরিজ ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’-এর কাশফ ও জারুনের দারুণ জনপ্রিয় সম্পর্ক। এই সিরিজের ‘এক চায়ে কা কাপ থা’ দৃশ্যটি আজও দর্শকরা সমান আগ্রহ ও উৎসাহের সাথে ফেসবুকে শেয়ার করে থাকেন। সেখানেও অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কীভাবে একজন আদর্শ পুরুষ তাঁর প্রিয় মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও হতাশাভরা জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারেন।
অন্যদিকে, আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পাকিস্তানি রোমান্টিক ধারাবাহিক ‘তেরে বিন’ প্রচারিত হতে শুরু করেছিল ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর জিও টিভিতে। এই নাটকে নায়ক মুরতাসিম চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ওয়াহাজ আলী এবং নায়িকা মীরাবের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল ইয়ুমনা জায়েদিিকে। প্রেম-ভালোবাসা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের দুজন মানুষের মধ্যকার জটিল সম্পর্কের এই গল্পটি দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ড্রামার নায়ক মুরতাসিম কিন্তু আবু বকর বা জারুনের মতো শান্ত, ধীরস্থির বা নরম স্বভাবের মানুষ ছিল না। সে ছিল বেশ রাগী, জেদি এবং নিজের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অটল এক চরিত্র। অথচ এই নাটকটি মুক্তির সময়ও তা বহু তরুণী ও নারীর কাছে অত্যন্ত পছন্দের একটি চরিত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল। কারণ, তার রাগী স্বভাবের আড়ালেও প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিল, সে যেকোনো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে জানত এবং ভালোবাসার মানুষকে সব সময় আগলে রাখতে চেয়েছিল। যদিও নাটকের খাতিরে বা চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে যে আচরণগুলোকে অত্যন্ত রোমান্টিক বা আকর্ষণীয় বলে মনে হয়, বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে সেই একই আচরণ সব সময় ভালো কিংবা মানসিকভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
























