দিনাজপুরের কন্যা, দিনাজপুরেই বেড়ে ওঠা। এই জেলার মানুষের প্রতি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। সেই প্রিয় নেত্রীকে হারিয়ে শোকে কাতর দিনাজপুরের মানুষ।
এই জনপদে কেটেছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব-কৈশোর। পড়াশোনাও এই জেলাতে। উত্তরের জেলা দিনাজপুরের মানুষ ‘খালেদা জিয়া’ হিসেবে নয়, তাকে ‘খালেদা খানম পুতুল’ নামেই বেশি চেনেন। সেই পুতুলকে হারিয়ে শোকে কাতর দিনাজপুরবাসী স্মৃতিচারণ করে চোখের জল মুছছে বারবার। শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন দিনাজপুরের সব শ্রেণির মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে দেশের তো বটেই, দিনাজপুরেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরপরই সকাল থেকেই দলীয় কার্যালয়ে কোরআন তেলাওয়াতের আয়োজন করা হয়। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে, নেতারা দিনাজপুরকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন তা পূরণ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। খালেদা জিয়া দিনাজপুর-৩ আসন থেকে এবার প্রার্থী হয়েছিলেন। এ নিয়ে ছিল নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। তবে তার মৃত্যুর সংবাদে তা নিমিষেই ম্লান গেছে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দিনাজপুরের তথা বাংলাদেশের যে ক্ষতি হলো তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তিনি এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন এবং ব্যাপক উন্নয়ন করবেন এমন আশা ছিল আমাদের। কিন্তু তার মৃত্যুতে আমাদের শোকের অন্ত নেই। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। দিনাজপুরকে নিয়ে, দিনাজপুরের মানুষকে নিয়ে, দিনাজপুরের উন্নয়ন নিয়ে খালেদা জিয়ার যে স্বপ্ন, তা আমরা পূরণ করার চেষ্টা করবো। তার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান তার মায়ের স্বপ্নগুলো পূরণ করবেন।’
তিনি জানান, ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়া জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার শ্রীপুর থানার ফুলগাজীর বাসিন্দা। তবে তিনি ১৯১৯ সালে পড়াশোনার জন্য জলপাইগুড়িতে যান। সেখানে পড়াশোনার সময়ই শুরু করেন ব্যবসা, হয়ে ওঠেন ব্যবসায়ী। ১৯৩৭ সালে পঞ্চগড়ের বোদা এলাকার চন্দনবাড়ীর মেয়ে তৈয়বা মজুমদারকে বিয়ে করেন ইস্কান্দার মজুমদার। পঞ্চগড়ের বোদা সেই সময়ে ভারতের জলপাইগুড়ির অর্ন্তগত ছিল।
১৯৪৭ সালে ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদার দিনাজপুরের ঘাসিপাড়া এসে বসবাস শুরু করেন। তখন খালেদা জিয়ার বয়স ২ বছর। ৫ বছর বয়সে তাকে দিনাজপুর মিশনারি কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এই বিদ্যালয় থেকেই তার শিক্ষাজীবন শুরু এবং পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে খালেদা জিয়া এই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাস করেন। ওই বছরই সেনাবাহিনীর সদস্য ও বগুড়ার বাগবাড়ী এলাকার ছেলে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ওই সময়ে জিয়াউর রহমান দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।
মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, ‘শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন খালেদা জিয়ার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই। খালার বাড়িতে বেড়াতে আসার পর খালেদা জিয়াকে পছন্দ করেন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান। পরে দুই পরিবারের আলোচনা ও সম্মতিতে তাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত স্বামীকে নিয়ে এই জেলাতেই ছিলেন খালেদা জিয়া। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তৎকালীন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। যা বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজ।
‘চাকরির সুবাদে ১৯৬৫ সালে খালেদা জিয়া স্বামী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন জিয়াউর রহমান। পরে ১৯৬৯ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। বদলি হওয়ার পর তারা চট্টগ্রামের ষোলশহরে বসবাস শুরু করেন। তবে মাঝেমধ্যেই দিনাজপুরে আসতেন, থাকতেন মায়ের বাড়িতে।
‘খালেদা জিয়ার বড় বোন বেগম খুরশীদ জাহান হক ছিলেন দিনাজপুর থেকে দুইবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ওই সময়ে খুরশীদ জাহান হক মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
‘খালেদা জিয়ার বাবা বালুবাড়ী এলাকায় একটি বাড়ি তৈরি করেন। খালেদা জিয়ার মায়ের নামে বালুবাড়ীর বাড়িটির নামকরণ করা হয় তৈয়বা ভিলা। দলীয় প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীর মায়ের বাড়ি হিসেবে এই বাড়িটির ব্যাপক পরিচিতি ছিল।’
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবে দেশনায়ক তারেক রহমানের হাত ধরে এই দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হবে। আমরা এখন শুধু চাইবো, আল্লাহ যেন দেশমাতা খালেদা জিয়াকে শ্রেষ্ঠ জান্নাত নসিব করেন।’
দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে আজ অত্যন্ত বেদনাবিধুর একটি দিন। আমরা শোকে কাতর। তার মৃত্যুতে দিনাজপুরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’
রিপোর্টারের নাম 






















