জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে সফলভাবে একসঙ্গে পথ চললেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান দুই শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে জামায়াত সম্পূর্ণ অনড় রয়েছে। অন্যদিকে, জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক দল হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনে আশানুরূপ আসন সমঝোতা বা ছাড় না পাওয়ায় এনসিপি এখন নিজেদের পূর্ণ শক্তিতে নির্বাচনী মাঠে নামার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। প্রার্থী ছাড় ও নিজস্ব নির্বাচনী কৌশল, বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এনসিপির একাংশের তীব্র অসন্তোষ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণের ধরন—সব মিলিয়ে জোটের এই দুই প্রধান শরিক দলের পারস্পরিক সম্পর্কে একধরনের দৃশ্যমান অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তবে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার এই সিদ্ধান্তকে কোনো পক্ষই জোটে ভাঙনের লক্ষণ হিসেবে দেখতে নারাজ। উভয় দলের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জাতীয় সংসদ ও রাজপথের যুগপৎ আন্দোলনে ১১ দলীয় ঐক্য আগের মতোই সম্পূর্ণ অটুট থাকবে। রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ এবং গণহত্যার বিচারের মতো অভিন্ন ও মৌলিক রাজনৈতিক ইস্যুতে তাদের অবস্থানে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসন সমঝোতার প্রশ্নে আপাতত বরফ গলার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের মাঠে দুই দলের এই আলাদা ও স্বাধীন অবস্থান ভবিষ্যতে জোটের রাজনৈতিক সমীকরণে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটিতে আলোচনা শুরু হলে এনসিপিসহ কয়েকটি দল জোটগতভাবে অথবা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। বিশেষ করে ঢাকার অন্তত একটি সিটি করপোরেশনে এনসিপির প্রার্থীকে জোরালো সমর্থন দেওয়ার জন্য দলটির পক্ষ থেকে জোরালো আগ্রহ দেখানো হয়। এ বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগও করে এনসিপির সর্বোচ্চ ফোরামের একটি প্রতিনিধি দল। সূত্র জানায়, এনসিপি ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পক্ষে জামায়াতের সমর্থন দাবি করেছিল; কিন্তু জামায়াত সেই দাবি মেনে নেয়নি। যদিও এর বিপরীতে কুমিল্লাসহ দেশের দুটি সিটি করপোরেশনে এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের কিছু আগ্রহ ছিল। তবে কোন এলাকায় কোন দল প্রার্থী দেবে, কী পরিমাণ আসন ছাড় দেওয়া হবে এবং সমঝোতার ভিত্তি কী হবে—এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে দলগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্বে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
এই বিষয়ে জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক যুক্তি হলো, অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিক দলগুলো বরাবরই আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। এবারও মূলত সেই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক রীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে। তাছাড়া, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কোনো দলের নিজস্ব প্রার্থী না থাকলে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া হলে তাতে দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। অন্যদিকে, এনসিপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিমত হলো, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সাংগঠনিক সহযোগিতা ও সমর্থনের কারণেই দলটির প্রার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফলাফল অর্জন করতে পেরেছিলেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনেও একই ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা পেলে ভালো ফল করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। আর এ কারণেই এনসিপি মূলত জোটগত সমঝোতার মাধ্যমেই নির্বাচনে অংশ নিতে বেশি আগ্রহী ছিল।
জামায়াতের এই অনীহার পেছনে তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক বাস্তবতা ও তৃণমূলের চাপও গভীরভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনে জোটের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক আসনে দলটিকে ছাড় দিতে হয়েছে, যার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া অনেক ত্যাগী ও যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে হয়েছিল। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি একইভাবে আসন ছাড় দিতে হয়, তবে দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক জটিলতা ও ক্ষোভ আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে মাঠ গুছিয়ে রাখা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা এবং দলীয় প্রার্থীদের নিজস্ব নির্বাচনী সক্ষমতা বাস্তবে যাচাই করার লক্ষ্যেই জামায়াতের হাইকমান্ড এককভাবে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিপরীতে এনসিপি নেতাদের জোরালো যুক্তি হলো, জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার কারণে দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও প্রকৃত জনসমর্থন কতখানি, তা স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করার সুযোগ মেলেনি। তাই স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সারা দেশে দলের প্রকৃত জনভিত্তি ও সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এবং একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির শিকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এই কারণে সমঝোতা না হলেও নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী মাঠে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে কোনোভাবেই সরে আসছে না দলটি।
স্থানীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা না হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের সামগ্রিক ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়েও এনসিপির অন্দরে বেশ কিছু অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। দলটির একটি অংশের অভিযোগ, সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জোরালো ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে একধরনের আপসকামী ও নমনীয় কৌশল অবলম্বন করে এগোচ্ছে। সরকার বা সরকারি দলের নানা জনবিরোধী ও বিতর্কিত বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের দলীয় বক্তব্য ও কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত দৃঢ়তা ও আগ্রাসী মনোভাবের অভাব রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত ও মারমুখী অবস্থান না নিয়ে দলটি কিছুটা অতিরিক্ত নমনীয়তা বা শৈথিল্য দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন এনসিপির কিছু নেতা।
অবশ্য জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে একটি দায়িত্বশীল, গঠনমূলক ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করাই তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য। ন্যায়সংগত ও জনকল্যাণমূলক যেকোনো কার্যক্রমে সরকারকে সহযোগিতা এবং অন্যায় বা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের সোচ্চার প্রতিবাদ—এই সুনির্দিষ্ট নীতিতেই তারা এগিয়ে চলেছেন। সরকারের সঙ্গে শুধুই বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা নয়, বরং সাধারণ মানুষের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে কার্যকর ভূমিকা পালন করাই তাদের বর্তমান কৌশল। ফলে জামায়াতের এই পরিমিত অবস্থান এনসিপির কিছু নেতার প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাচ্ছে না, যার ফলে দুই দলের রাজনৈতিক কৌশল ও কর্মপদ্ধতিতে স্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দলটির কয়েকজন নেতার বক্তব্যেও এই অন্তর্নিহিত অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। গত শনিবার যশোরে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাবেশে জামায়াত নেতাদের উপস্থিতিতেই এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচনায় আসে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর সৌজন্য সাক্ষাতের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। যদিও পরবর্তীতে ওই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত শনিবার ঠাকুরগাঁওয়ে এবং রোববার ঢাকায় পৃথকভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। এনসিপির একাংশের মতে, বিরোধী দলের রাজনীতির মাঠে আরও অনেক বেশি সক্রিয়, প্রতিবাদী ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া দরকার, বিশেষ করে সরকার ও সরকারি দলের বিরুদ্ধে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। অন্যদিকে, জামায়াত মনে করে সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি দায়িত্বশীল রাজপথের কর্মসূচি পালনই হলো সঠিক পথ। দুই দলের এই কৌশলগত ব্যবধান স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
১১ দলীয় ঐক্যের সাম্প্রতিক লংমার্চের কর্মসূচিগুলোতেও দুই দলের মধ্যকার সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে। গত শনিবার ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতাই অংশ নেননি। এর আগে জোটের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং রংপুরমুখী পূর্বের দুটি লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সরব উপস্থিতি দেখা গেলেও এবার তার ব্যতিক্রম ঘটায় দুই দলের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে উদ্বোধনী সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতারা সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও পরবর্তী লংমার্চের বহরে এনসিপির বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতা অংশ নেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আব্দুল হান্নান মাসউদ, যুগ্ম সদস্যসচিব এসএম সাইফ মুস্তাফিজ ও ফরিদুল হক এবং খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিন ইসা। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মীও এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হন।
লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে নিজেদের অনুপস্থিতির বিষয়টি জামায়াতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগে থেকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তবে তিনি স্বীকার করেন যে পরবর্তী সমাবেশগুলোতে এনসিপির নেতারা ঠিকই সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। এনসিপির পক্ষ থেকেও জোরালোভাবে জানানো হয়েছে যে জোটের যৌথ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। ফলে একটিমাত্র কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের সাময়িক অনুপস্থিতিকে জোট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কোনো ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে রাজি নয় উভয় পক্ষের কেউই।
উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে অংশ নিয়ে জামায়াত ৬৮টি, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে বিজয় অর্জন করেছিল। পরবর্তীতে নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনে আরও ১৩টি নতুন আসন যুক্ত হয়, যার মধ্যে জামায়াত ৯টি, এনসিপি ২টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জাগপা ১টি করে আসন লাভ করে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদে বিরোধী দলের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক মাঠেও তারা বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়, জুলাই সনদ এবং গণহত্যার বিচারের মতো জাতীয় ইস্যুতে শরিক দলগুলোর মধ্যে চমৎকার সমন্বয় থাকলেও স্থানীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক কৌশলগত পার্থক্যের কারণে দুই দলের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়তির দিকে রয়েছে।
এ বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অতীতেও যখন জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে কিংবা সরকারে অংশীদার হয়েছে কিংবা রাজপথের আন্দোলনে শরিক থেকেছে, তখনও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে প্রতিটি দল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আলাদাভাবে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশের জোটগত রাজনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই ধরনের রাজনৈতিক রীতিই চলে আসছে এবং এবারও সেই প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, কোনো বিশেষ এলাকায় যদি কোনো দলের নিজস্ব প্রার্থী না থাকে কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে যদি পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে ওঠে, তবে তাতে কোনো বাধা নেই। স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা পথ বেছে নেওয়ার কারণে ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াত-এনসিপির পারস্পরিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্যে এই ঐক্য সম্পূর্ণ অটুট থাকবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধানও জোটে কোনো ধরনের ভাঙনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, লিয়াজোঁ কমিটির দীর্ঘ আলোচনার পরই জোটের শীর্ষ নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার এই যুগপৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার অর্থ কখনোই জোটে ভাঙন ধরা নয়। এর আগে গত ২৭ অক্টোবর ১১ দলের বৈঠক শেষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও একই ধরনের যৌথ সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। জামায়াতের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি হলেও ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ার বিন্দুমাত্র কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারাও। তাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচন, বিরোধী দলের ভূমিকা কিংবা রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে কিছু মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের মতো জাতীয় ও অভিন্ন ইস্যুতে জোটের অবস্থানে কোনো নড়চড় হয়নি। তবে জোটে থাকলেও এনসিপি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার স্পষ্ট করে বলেন যে এনসিপি ১১ দলীয় ঐক্যেই শক্তভাবে আছে এবং জোট ভাঙার সমস্ত গুঞ্জন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সরকারের পক্ষ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধী জোটকে ভাঙার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জোরালো অভিযোগ করেন।
গত রোববার এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে জানান যে, সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের মূল প্রশ্নে জোটে কোনো ধরনের দূরত্ব নেই এবং তারা সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সমমনা সদস্যদের নিয়ে সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সম্প্রসারিত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা খুব দ্রুত মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। তবে জোটের অংশীদার হলেও এনসিপি যে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াবে না, সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে দলটির নিজস্ব পৃথক রাজনীতি ও আদর্শ রয়েছে। জোটে থাকলেও অন্য কোনো দলের নেতাদের সমস্ত নীতি বা কর্মকাণ্ড অন্ধভাবে সমর্থন করার কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি তারা অনুসরণ করবেন না এবং সরকার বা বিরোধী দল—যারাই কোনো ভুল বা অন্যায় করবে, তাদের সবার বিরুদ্ধেই এনসিপি শক্তভাবে জবাবদিহিতা চাইবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘আমরা কোনো প্রথাগত জোটের রাজনীতি করি না, কোনো নির্দিষ্ট বিরোধী দলের তাঁবেদারি রাজনীতিও করি না।’
যেকonো সমঝোতা ছাড়াই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই প্রধান দলই এখন তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি পুরোদমে এগিয়ে নিচ্ছে। জামায়াত ইতিমধ্যে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্ভাব্য সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ অনেকটাই চূড়ান্ত করে ফেলেছে। গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর একটি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে দলটির পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমকে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। দলটির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনেও সম্পূর্ণ সৎ, দক্ষ ও জনগ্রহণযোগ্য প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গত গত ২৯ মার্চ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে নিজেদের মেয়র পদপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল এনসিপি। পরবর্তীতে পরিস্থিতির প্রয়োজনে ঢাকার দুই সিটিতে তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়। গত ৩০ অক্টোবর দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নতুন প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, যেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র পদে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। প্রার্থী পরিবর্তনের পর থেকেই ঢাকার দুই সিটিতে এই দুই প্রার্থীর পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এবং নানামুখী প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
গত শুক্রবার এক বিশেষ বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যেও স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে আমরা সম্পূর্ণ এককভাবেই অংশগ্রহণ করব। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য এনসিপি ইতিমধ্যে তাদের যাবতীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।’ এনসিপির নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, এককভাবে নির্বাচনে লড়লে দলটির প্রকৃত সাংগঠনিক শক্তি ও সাধারণ মানুষের জনসমর্থনের সঠিক চিত্রটি সবার সামনে উন্মোচিত হবে এবং এর মধ্য দিয়ে সারা দেশে দলীয় শেকড় ও ভিত্তি আরও বহুগুণ সুদৃঢ় হবে। অন্যদিকে জামায়াতের মূল কৌশল হলো তৃণমূল পর্যায়ে নিজস্ব মজবুত সাংগঠনিক শক্তি ও পরীক্ষিত প্রার্থীদের অবস্থানকে আরও পাকাপোক্ত করা।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে, জাতীয় নির্বাচনে কৌশলগতভাবে একসঙ্গে লড়াই করে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র রণকৌশলে এগোচ্ছে। একদিকে জামায়াত তাদের পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অবস্থানে অনড় রয়েছে, অন্যদিকে সমঝোতার সমস্ত আশা ত্যাগ করে এনসিপি তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে রাজপথ ও নির্বাচনী ময়দানে নেমে পড়েছে। যদিও উভয় দলের শীর্ষ নেতারা মুখে জোট অটুট থাকার জোরালো দাবি করে চলেছেন, তথাপি স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংসদে বিরোধী দলের গঠনমূলক বা জোরালো ভূমিকা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক কৌশলের এই দৃশ্যমান ব্যবধান ভবিষ্যতে ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সমন্বয় ও ঐক্যকে কতটা অটুট রাখতে পারে, এখন সেটাই দেখার প্রধান বিষয়।

























