মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৮:১১ পূর্বাহ্ন | ২৯শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ১৩ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

দেশের অর্থনীতি মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: পিআরআই

  • হালনাগাদ সময় : ১১:৫৫:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধি কমে এলেও সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এমন মূল্যায়ন করেছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।

রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাজধানীতে ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’– এর নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) সহযোগিতায় পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) এ আয়োজন করে।

আংশিক স্থিতিশীলতা, তবে প্রবৃদ্ধি দুর্বল

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাবিনিময় হারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার প্রবণতা এবং মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে আংশিক স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে বিনিয়োগ হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বাড়ার কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।

খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, বিশেষ করে চালের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কাঠামোগত সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।

বিনিয়োগ ফেরাতে নীতি-নিশ্চয়তা জরুরি

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল নীতি পরিবেশে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার অনেকটাই নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণে অনুমানযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরবরাহ-পক্ষের সংস্কার ও কার্যকর বাণিজ্যনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে অর্থবহ কর সংস্কার ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিতই থাকবে বলে মন্তব্য করেন।

বিনিময় হার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, নামমাত্র বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল থাকলেও গত চার মাসে প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) ৬ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারে হস্তক্ষেপ পুরোপুরি সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ড. সাত্তার বলেন, স্বল্পমেয়াদে বিনিময় হারের মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন— উভয় ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক প্রভাব রয়েছে। অবমূল্যায়ন রফতানি উৎসাহিত করলেও মূল্যায়ন আমদানি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকুচিত না হলেও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিক সম্ভাব্য ৬ শতাংশের অনেক নিচে নেমে এসেছে।

খেলাপি ঋণ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের পরও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আংশিকভাবে ফিরেছে উল্লেখ করে ড. জাইদী সাত্তার বলেন, খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছালেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মূল উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৬ সালে দ্রুত নীতিগত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে— এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিশ্চয়তাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে নমনীয় ও দ্রুত অভিযোজনযোগ্য নীতিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা

প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসই তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে— যেখানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। কঠোর মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে: হুমায়ুন কবীর

28 October 2026

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে, ফল মেনে নেব: বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

দেশের অর্থনীতি মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: পিআরআই

হালনাগাদ সময় : ১১:৫৫:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের মন্থর স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধি কমে এলেও সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে আংশিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এমন মূল্যায়ন করেছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)।

রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাজধানীতে ‘মান্থলি ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’– এর নভেম্বর সংখ্যা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) সহযোগিতায় পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) এ আয়োজন করে।

আংশিক স্থিতিশীলতা, তবে প্রবৃদ্ধি দুর্বল

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাবিনিময় হারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার প্রবণতা এবং মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে আংশিক স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে বিনিয়োগ হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বাড়ার কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।

খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, বিশেষ করে চালের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কাঠামোগত সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।

বিনিয়োগ ফেরাতে নীতি-নিশ্চয়তা জরুরি

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল নীতি পরিবেশে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার অনেকটাই নির্ভর করবে নীতিনির্ধারণে অনুমানযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতার ওপর।

তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরবরাহ-পক্ষের সংস্কার ও কার্যকর বাণিজ্যনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে অর্থবহ কর সংস্কার ছাড়া সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিতই থাকবে বলে মন্তব্য করেন।

বিনিময় হার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, নামমাত্র বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল থাকলেও গত চার মাসে প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার (আরইইআর) ৬ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারে হস্তক্ষেপ পুরোপুরি সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ড. সাত্তার বলেন, স্বল্পমেয়াদে বিনিময় হারের মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়ন— উভয় ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক প্রভাব রয়েছে। অবমূল্যায়ন রফতানি উৎসাহিত করলেও মূল্যায়ন আমদানি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকুচিত না হলেও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিক সম্ভাব্য ৬ শতাংশের অনেক নিচে নেমে এসেছে।

খেলাপি ঋণ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের পরও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আংশিকভাবে ফিরেছে উল্লেখ করে ড. জাইদী সাত্তার বলেন, খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছালেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মূল উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৬ সালে দ্রুত নীতিগত স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে— এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিশ্চয়তাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে নমনীয় ও দ্রুত অভিযোজনযোগ্য নীতিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা

প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সহিংসতা অর্থনৈতিক টেকসই তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে— যেখানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। কঠোর মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Share this news as a Photo Card