প্রযুক্তির বৈপ্লবিক বিস্তারের সুবাদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হলেও অনলাইন মাধ্যমে হয়রানি, প্রতারণা ও নানা ধরনের সামাজিক নিপীড়নের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা দিন দিন ডিজিটাল সহিংসতার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে রূপ নিচ্ছে।
ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান, ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খোলা, কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট প্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিকৃত ছবি তৈরি করা এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধের কারণে বহু মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন।
‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’ (সিএসডব্লিউসি) নামক জোটের ফেসবুক পেজে গত ২১ মাসে জমা হওয়া ৮০টি নির্দিষ্ট অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৫৫ জনই নারী ভুক্তভোগী। অর্থাৎ প্রাপ্ত মোট অভিযোগের প্রায় ৬৯ শতাংশ বা সাত-দশমাংশই নারী কেন্দ্রিক।
‘অক্টোবর সাইবার সচেতনতা মাস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে সিএসডব্লিউসি।
প্ল্যাটফর্মটির প্রদত্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ মাধ্যমে মোট ৮০টি সাহায্য চেয়ে আবেদন আসে। এর মধ্যে ৫৫ জন নারী এবং ১২ জন পুরুষ সরাসরি ভুক্তভোগী। বাকি ১৩টি আবেদনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর লিঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে পুরুষদের জমা দেওয়া ১২টি আবেদনের প্রকৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেখা গেছে, ১২ জন পুরুষ আবেদনকারীর মধ্যে ৫ জন নিজের কোনো সমস্যার জন্য নয়, বরং নিজ স্ত্রী, অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাসন্তান, ভাগ্নি কিংবা অন্য কোনো নারী স্বজনের সাইবার সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন। যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, অভিযোগের ধরন অনুযায়ী নারী ও কিশোরীরাই মূলত অনলাইন হয়রানির প্রধান শিকার।
সিএসডব্লিউসি জানিয়েছে, সাইবার স্পেসের সহিংসতা কেবল এক একক ব্যক্তির মানসিক শান্তি বিনষ্ট করে না; বরং এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো পরিবারকে তাড়া করে। সামাজিক কুসংস্কার, হয়রানির ভয়, সম্মানহানির চিন্তা এবং পারিপার্শ্বিক নানা বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক নারী এখনো সরাসরি এসে অভিযোগ দায়ের করতে ভয় পান। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা এই পরিসংখ্যানে ভেসে ওঠা চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি ও ভয়াবহ বলে মনে করছে জোটটি।
জমা হওয়া অভিযোগগুলোর প্রধান প্রধান ধরন:
- ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো।
- আপত্তিকর ও গোপন তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া।
- ভুয়া আইডি বা ফেক প্রোফাইল তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ বা বিকৃত ছবি প্রস্তুত ও প্রচার করা।
- অনলাইনে নানা উপায়ে অর্থ বা সুবিধা আদায়ে ব্ল্যাকমেইল করা।
সংগঠনটি উল্লেখ করে যে, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণহীন অপব্যবহার এবং এআই-চালিত বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যক্তির মৌলিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত প্রাইভেসি এবং সার্বিক ডিজিটাল সুরক্ষার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। অনলাইনে যেকোনো সংবেদনশীল বার্তা বা ছবি চোখের পলকে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা ভুক্তভোগীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
অনলাইনে সংঘটিত এসব অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে একটি ভুক্তভোগী-বান্ধব অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু, দ্রুততর তদন্ত কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে সিএসডব্লিউসি।
একই সাথে নিজেদের আইডি ও অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখা, অচেনা বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা এবং সত্যতা যাচাই ছাড়া যেকোনো তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশু ও তরুণদের অনলাইন কার্যকলাপের ওপর নজর রাখার জন্য অভিভাবকদের প্রতি সচেতন হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের আইন সহায়তা ও মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা ‘ব্লাস্ট’-এর নেতৃত্বে ১৭টি বিশিষ্ট সামাজিক সংগঠনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ‘সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন’ প্ল্যাটফর্ম। ব্লাস্ট এর আহ্বায়ক, সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিক্যাফ) যুগ্ম আহ্বায়ক এবং নারীপক্ষ সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।


























