ঢাকা ০২:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

অস্তিত্ব সংকটে রাজবাড়ীর পদ্মা: ধু-ধু বালুচরে বিপন্ন জনপদ ও কৃষি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০১:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

রাজবাড়ী জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্ত পদ্মা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্য সংকটে ধুঁকতে থাকা এই নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর, যার ফলে নদী হারিয়েছে তার চিরচেনা রূপ ও গতিপথ। জেলার প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পানিশূন্যতার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরের বাসিন্দা, মৎস্যজীবী ও কৃষিজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ীর দীর্ঘ সীমানাজুড়ে পদ্মা নদী তার যৌবন হারিয়ে এখন রুগ্ন দশায় উপনীত। নদীর গতিপথ এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে, অনেক স্থানেই হেঁটেই নদী পার হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশাল বিশাল বালুচরের কারণে নদীর গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নৌ-চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হাকিম মণ্ডলের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে নদীর ভিন্ন এক রূপ। তিনি জানান, তিন দশক আগেও এই নদীতে সারা বছর পানির প্রবল প্রবাহ থাকত। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ওপারের চরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত ফসল এপারে আনতে কৃষকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আগে যে পথ পাড়ি দিতে নৌকায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগত, এখন সেখানে চরের কারণে ১৫-২০ মিনিটেই পার হওয়া গেলেও ফসলের বোঝা নিয়ে মাইলের পর মাইল বালুপথ হাঁটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘোড়া বা মহিষের গাড়ির ওপর নির্ভর করতে গিয়ে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

শুধু যাতায়াত নয়, সুপেয় ও ব্যবহার্য পানির সংকটও এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম জানান, নদীর নাব্য হ্রাসের প্রভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, ফলে অনেক টিউবওয়েলে এখন আর পানি উঠছে না। এছাড়া চরাঞ্চলের শত শত গবাদিপশুকে গোসল করানো এবং পানি খাওয়ানোর জন্য কৃষকদের ২-৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নদীর তলানিতে আসতে হচ্ছে। স্থানীয় খাল-বিলগুলো আগেই শুকিয়ে যাওয়ায় পদ্মার এই শীর্ণ ধারাই এখন গবাদিপশুর একমাত্র ভরসা।

নদীর এই করুণ দশার পেছনে উজানের পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজবাড়ী সদর বিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত কুমার জানান, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ভারত থেকে পানির পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকা এবং নদীর উপরিভাগের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এর মূল কারণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূল নদীতে পানি না থাকায় শাখা নদীগুলোও ক্রমান্বয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, যার ফলে পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে নাব্য সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বর্তমানে এ বিষয়ে একটি কারিগরি জরিপ চলমান রয়েছে, যার প্রতিবেদন হাতে পেলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা: ২০ প্রদেশ লক্ষ্যবস্তু, রেড ক্রিসেন্টের সতর্কবার্তা

অস্তিত্ব সংকটে রাজবাড়ীর পদ্মা: ধু-ধু বালুচরে বিপন্ন জনপদ ও কৃষি

আপডেট সময় : ১০:০১:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজবাড়ী জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্ত পদ্মা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্য সংকটে ধুঁকতে থাকা এই নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর, যার ফলে নদী হারিয়েছে তার চিরচেনা রূপ ও গতিপথ। জেলার প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পানিশূন্যতার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরের বাসিন্দা, মৎস্যজীবী ও কৃষিজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ীর দীর্ঘ সীমানাজুড়ে পদ্মা নদী তার যৌবন হারিয়ে এখন রুগ্ন দশায় উপনীত। নদীর গতিপথ এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে, অনেক স্থানেই হেঁটেই নদী পার হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশাল বিশাল বালুচরের কারণে নদীর গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নৌ-চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হাকিম মণ্ডলের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে নদীর ভিন্ন এক রূপ। তিনি জানান, তিন দশক আগেও এই নদীতে সারা বছর পানির প্রবল প্রবাহ থাকত। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ওপারের চরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত ফসল এপারে আনতে কৃষকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আগে যে পথ পাড়ি দিতে নৌকায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগত, এখন সেখানে চরের কারণে ১৫-২০ মিনিটেই পার হওয়া গেলেও ফসলের বোঝা নিয়ে মাইলের পর মাইল বালুপথ হাঁটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঘোড়া বা মহিষের গাড়ির ওপর নির্ভর করতে গিয়ে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

শুধু যাতায়াত নয়, সুপেয় ও ব্যবহার্য পানির সংকটও এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম জানান, নদীর নাব্য হ্রাসের প্রভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, ফলে অনেক টিউবওয়েলে এখন আর পানি উঠছে না। এছাড়া চরাঞ্চলের শত শত গবাদিপশুকে গোসল করানো এবং পানি খাওয়ানোর জন্য কৃষকদের ২-৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নদীর তলানিতে আসতে হচ্ছে। স্থানীয় খাল-বিলগুলো আগেই শুকিয়ে যাওয়ায় পদ্মার এই শীর্ণ ধারাই এখন গবাদিপশুর একমাত্র ভরসা।

নদীর এই করুণ দশার পেছনে উজানের পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজবাড়ী সদর বিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত কুমার জানান, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ভারত থেকে পানির পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকা এবং নদীর উপরিভাগের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এর মূল কারণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মূল নদীতে পানি না থাকায় শাখা নদীগুলোও ক্রমান্বয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, যার ফলে পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে নাব্য সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বর্তমানে এ বিষয়ে একটি কারিগরি জরিপ চলমান রয়েছে, যার প্রতিবেদন হাতে পেলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।