রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের পাল বংশের হাতে শত শত বছর ধরে টিকে আছে এক অনন্য শিল্পকর্ম—শখের হাঁড়ি। বাহারি রঙ, সূক্ষ্ম নকশা আর নিখুঁত কারুকাজে তৈরি এই হাঁড়ি একসময় মেলা মাতিয়েছে, কুড়িয়েছে দেশ-বিদেশের প্রশংসা। কিন্তু স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত সেই ঐতিহ্যবাহী শখের হাঁড়ি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে একাই সংগ্রাম করে যাচ্ছেন প্রবীণ কারিগর সুশান্ত কুমার পাল।
শৈশবে বাবা ভোলানাথ পালের হাত ধরে হাঁড়ি তৈরিতে হাতেখড়ি হয়েছিল সুশান্তের। বাবার স্বপ্ন ছিল তাঁদের এই শিল্পকর্ম একদিন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবে। সেই স্বপ্ন পূরণে নিরলস পরিশ্রম করেছেন সুশান্ত। ফলস্বরূপ, তিনি অর্জন করেছেন ১৮টি দক্ষ কারিগর পুরস্কার, ৪টি শ্রেষ্ঠ কারুশিল্প পুরস্কার, ১টি স্বর্ণপদক এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা। এছাড়া বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩২টি সনদও তাঁর ঝুলিতে। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়েও স্থান পেয়েছে শখের হাঁড়ির গল্প। দেশের বাইরে জাপানেও তিনি বাংলাদেশের কারুশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে সম্মাননা আর পদকের ঝুলি ভারী হলেও, জীবনযুদ্ধে আজও সচ্ছলতা অধরাই রয়ে গেছে এই গুণী শিল্পীর।
মূলত বৈশাখীমেলা, বাণিজ্যমেলা, রথের মেলা, কুটির শিল্প মেলাসহ দেশের বিভিন্ন মেলা ছিল শখের হাঁড়ি বিক্রির প্রধান মাধ্যম। রাজশাহীর স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা কম থাকলেও ঢাকাসহ অন্যান্য মেলাতে এর কদর ছিল বেশ। তবে করোনা মহামারির পর থেকে দেশের মেলাগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন সুশান্ত পাল ও তাঁর পরিবার।
দুই বছর ধরে স্টলের ভাড়া বকেয়া, এমনকি প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে আক্ষেপ করে জানান এই শিল্পী। তাঁর কথায়, “পরিবার নিয়ে চরম দুর্দশায় জীবন কাটছে আমার। করোনা আসার পর থেকে আমরা বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছি। প্রচুর মাল আছে, বেচাকেনা নেই। শখের হাঁড়ি নিয়ে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়েছে, বইয়ের পাতায়ও নাম এসেছে। কিন্তু আসেনি সচ্ছলতা। সবাই হাঁড়ি নিয়ে ভাবলেও আমাদের পেটে ভাত জোটে না, এটা কেউ ভাবে না। যা বিক্রি হয় তাতে খাবারের টাকাও হয় না।” সম্মাননা পেলেও সচ্ছলতা না আসায় তাঁর প্রজন্ম হুমকির মুখে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। “না পারছি ছেড়ে দিতে, না পারছি কাজ চালিয়ে যেতে। এভাবে চলতে থাকলে বিলুপ্তির পথেই যাবে শখের হাঁড়ি,” হতাশার সুরে বলেন সুশান্ত।
পোড়ামাটির শিল্পের অস্তিত্ব হারাতে বসার কারণ ব্যাখ্যা করে সুশান্ত জানান, একসময় রাজশাহীতে সাড়ে চার হাজারের বেশি কারিগর এই পোড়ামাটির শিল্পে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে গুটিকয়েক ছাড়া প্রায় সবাই পেশা বদলেছেন। প্লাস্টিক ও স্টিলের সহজলভ্য পণ্যের ভিড়ে মাটির হাঁড়ি-কলসি, বদনা, গুড়ের হাঁড়ি, মুড়ির হাঁড়ির চাহিদা কমেছে ব্যাপকভাবে, যা এই শিল্পের অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ। তিনি অভিযোগ করেন, কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের স্টলগুলোতে অনেক সময় প্রকৃত কারুশিল্পীর বদলে অন্য বিক্রেতারা বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য কিনে এনে বিক্রি করেন। এতে তারা লাভবান হলেও প্রকৃত কারিগররা অবহেলিতই থেকে যান।
শখের হাঁড়ির উত্থানের গল্প বলতে গিয়ে সুশান্ত স্মরণ করেন রাজশাহী বিসিকের নকশাবিদ আলাউদ্দিনের কথা। তাঁর উদ্যোগেই ঢাকার বিজয় সরণিতে এক মেলায় পণ্যটির প্রদর্শনী ও বিক্রির সুযোগ মেলে, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সেই থেকে গ্রামবাংলা থেকে ঢাকায় উঠে আসে শখের হাঁড়ির সুদিন। শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর, লোক কারুশিল্প জাদুঘর, চারুকলা বিভাগ, বাংলা একাডেমি, চীন-মৈত্রী সম্মেলনসহ বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করে শখের হাঁড়ি। শুধু দেশেই নয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাপানেও পৌঁছেছে এই হাঁড়ি, যেখানে প্রবাসী বাঙালিদের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে এটি নৈপুণ্যেখচিত সেরা নকশিহাঁড়ির উপাধি লাভ করে।
সমৃদ্ধ এই পণ্যটি ধরে রাখতে চান সুশান্ত। এজন্য তিনি নিজের দুই ছেলে সঞ্জয় ও মৃত্যুঞ্জয়, মেয়ে সুচিত্রা এবং পুত্রবধূদেরও এই শিল্পে দক্ষ করে তুলেছেন। তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর শঙ্কা কাটছে না। সুশান্তের বিশ্বাস, সঠিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বিপণন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহী শখের হাঁড়ি আবারও দেশ-বিদেশে সমাদৃত হতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।
রিপোর্টারের নাম 












