সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের আলোচনায় উঠে আসছে ‘আপসহীন নেত্রী’ খ্যাত এই রাষ্ট্রনায়কের শেষ বিদায়ের কথা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে দিনভর অফিসপাড়া, বাজার-দোকান, অলি-গলি-সবখানেই বিরাজ করছে শোকের আবহ। চট্টগ্রামবাসী শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে তার অবদানের কথা।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের শোকার্ত নেতাকর্মীরা নগরীর নুর আহমদ সড়কে অবস্থিত দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন। এ সময় দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে নীরব শ্রদ্ধা জানান এবং খতমে কোরআনসহ দোয়া মাহফিল করেন।
চট্টগ্রামের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সম্পর্ক ছিল গভীর ও আবেগঘন। তিনি চট্টগ্রামকে ভালোবাসতেন এবং যেকোনও দুর্যোগে এই নগরীতে ছুটে আসতেন। বন্দরনগরী ছিল তার প্রিয় শহরগুলোর অন্যতম। তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় তার প্রথম সমাধি স্থাপন করা হয়।
রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের দুটি আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে এবং ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম সফরে আসেন। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনের পথে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাতযাপন করেন তিনি। এর আগে ২০১২ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের খুলশীর আকবর শাহ মাজারসংলগ্ন ইয়াছিন কলোনিতে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। ওই বছরের ২৬ জুন অতিবর্ষণে পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিন জনসহ সাত জন নিহত হন। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালের ভূমিকম্পে হামজারবাগ এলাকার সওদাগর ভিলা ভবন ধসে ২৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায়ও তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘২০০৮ সালে কারামুক্তির পর খালেদা জিয়ার জনসমাবেশ হয়েছিল চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। সেখানে তিনি কোনও দল বা প্রার্থীর কথা নয়, দেশ ও মানুষের অধিকারের কথা বলেছিলেন। গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১২ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধস এবং ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের সময় চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তিনি মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এটি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, মানবিক নেতৃত্বেরও দৃষ্টান্ত।’
চট্টগ্রামের উন্নয়নে খালেদা জিয়ার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকার চট্টগ্রামকে দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণার প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে। এর অংশ হিসেবে নগরীর আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া সেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম ও দীর্ঘতম স্বতন্ত্র কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর। ২০০৭ সালে টার্মিনালটি চালু হয়।
প্রাণিসম্পদ খাতে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৫ সালের ২৮ নভেম্বর খালেদা জিয়া চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সাইন্সেস ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন করেন।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কর্ণফুলী নদীর ওপর তৃতীয় সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয় বিএনপি সরকারের আমলে। কুয়েত সরকারের অর্থায়নে ২০০৬ সালের ৮ আগস্ট সেতুর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন খালেদা জিয়া। ২০১১ সালে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ভবন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট ইনস্টিটিউট ভবন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে রয়েছে খালেদা জিয়ার অবদান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক শোকবার্তায় বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, কিন্তু কখনও আপস করেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুতে জাতি হারালো একজন অভিভাবক, দেশ হারালো একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক। শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রামকে তিনি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন এবং এ অঞ্চলের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।’
রিপোর্টারের নাম 






















