ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ একরামুজ্জামান। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা। এই দুজন প্রার্থী হওয়ার বিষয় নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। অবশেষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় পাল্টে যাচ্ছে দুই আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১
সোমবার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শরিফুল ইসলামের কাছে একরামুজ্জামানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন নাসিরনগর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মো. জামসেদ মিয়া। এ সময় বুড়িশ্বর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বকুল তালুকদার, উপজেলা জাসাসের সিনিয়র সহসভাপতি ইমরানুল উপস্থিত ছিলেন।
একই আসনে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. ইসলাম উদ্দিন, জাতীয় পার্টির মো. শাহ আলম, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শরীফ মৃধা, খেলাফত মজলিশের এস এম শহিদ উল্লাহ, বিএনপির এম এ হান্নান, জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম আমিনুল ইসলাম, ইকবাল চৌধুরী (স্বতন্ত্র), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হুসাইন আহমদ, এ কে এম কামরুজ্জামান (স্বতন্ত্র), সৈয়দ নজরুল ইসলাম (স্বতন্ত্র), মো. হাবিবুর রহমান (স্বতন্ত্র) মনোনয়নপত্র জমা দেন। তবে একরামুজ্জামান প্রার্থী হওয়ায় এই আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীর অনুসারী ও স্থানীয় ভোটাররা।
সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ একরামুজ্জামান
স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফতে মজলিসের প্রার্থীরা নির্বাচনি মাঠে সরব আছেন শুরু থেকেই। তাদের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে সৈয়দ একরামুজ্জামান নির্বাচনে যোগ দেওয়ায় পাল্টে যাবে ভোটের হিসাব-নিকাশ।
আসনটিতে আগে কখনও জিততে পারেনি বিএনপি। ১৯৭০ সালের পর আওয়ামী লীগ আটবার, জাতীয় পার্টি দুবার, ন্যাপ একবার ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুবার জয়ী হয়েছেন।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে উপজেলায় একাধিকবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন কামরুজ্জামানের সমর্থকরা। উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বুড়িশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল চৌধুরীও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ফলে বিএনপির প্রার্থী জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জ।
এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন নাসিরনগর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ কে এম আমিনুল ইসলাম। তিনি উপজেলা জামায়াতের আমির। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের উপজেলা সভাপতি মাওলানা হুসাইন আহমেদ আলী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাইদুল্লা বিন আনসারী মাঠে আছেন।
সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ একরামুজ্জামানের পক্ষে মনোনয়ন জমা
একরামুজ্জামান আরএকে সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে জেলা ও উপজেলা বিএনপি একরামুজ্জামানকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কলার ছড়ি প্রতীকে ৮৯ হাজার ৪২৪ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন একরামুজ্জামান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নৌকার প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য বি এম ফরহাদ হোসেন। ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে রাজধানীর ঢাকা বোট ক্লাবে এক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন একরামুজ্জামান। পরে ২০২৪ সালের ২৬ জুন রাতে ৭৫ সদস্যবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে একরামুজ্জামানকে উপদেষ্টা করা হয়।
নেতাকর্মীরা বলছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে একরামুজ্জামানে পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে উপজেলাসহ ইউনিয়ন পর্যায়ের অর্ধশতাধিক পদধারী নেতাকর্মী সক্রিয় ছিলেন। পরে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ৩৭ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। এসব কারণে বোঝা যায়, তার আলাদা ভোট ব্যাংক আছে। তিনি প্রার্থী হওয়ায় এখানে ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে।
এর আগে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র এবং ২০০৮ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন একরামুজ্জামান। তিনবারই তিনি পরাজিত হন।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে একরামুজ্জামানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রুমিন ফারহানা নিজে উপস্থিত হয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
মনোনয়নপত্র দাখিলের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার বাইরে। আল্লাহর এই পরিকল্পনায় আমার বাবা ৭৩ সালে আওয়ামী লীগের জোয়ারের বিপক্ষে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। রাব্বুল আলামিনের কী অদ্ভুত পরিকল্পনা। ২০২৬ সালে এসে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে। আল্লাহর পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া মানুষের বোঝার বাইরে।’
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এবার সময় আসছে পরিবর্তনের। এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ভোট হবে জুলুমের বিপক্ষে। এই ভোট হবে ১৭ বছর যেই মহিলা মাঠে ছিল, তার পক্ষে। এই ভোট হবে যখন আপনারা মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন যে মানুষ আপনাদের পক্ষে সংসদে এবং সংসদের বাইরে কথা বলেছেন, এই ভোট হবে তার পক্ষে।’
ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি বিএনপির সমঝোতার মাধ্যমে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে।
এদিন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বিএনপি জোটের পক্ষ থেকে সরাইল উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন। পরে তিনি বলেন, ‘বিএনপির সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে রয়েছেন। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’
এ ছাড়া একই আসনে আম জনতা দলের শরিফা আক্তার, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. মাঈনউদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আবুল ফাতাহ মো. মাসুক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেছার আহমদ, জেএসডির তৈমুর রেজা মো. শাহজাদ, জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা, জামায়াতের মো. মোবারক হোসাইন, এস এন তরুণ দে (স্বতন্ত্র) ও এনসিপির আশরাফ উদ্দিন মাহদি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
জেলার ৬টি আসনে ৭৩ জনের মনোনয়নপত্র জমা
সবমিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৬টি আসনে ৭৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। ১০১ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শানিয়াজ্জামান তালুকদার এ তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১- (নাসিরনগর) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১২ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে ১১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে ১৪ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনে ১০ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে ১১ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে ১৫ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর আংশিক) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির মো. খালেদ হোসেন মাহবুব, খেলাফত মজলিশের হাফেজ মো. এমদাদ উল্লাহ, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের আয়েশা আক্তার, জাতীয় পার্টির রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, জামায়াতের মো. জোনায়েদ হাসান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নিয়াজুল করিম, মো. ওমর ইউসুফ খান (স্বতন্ত্র), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. আবু হানিফ, নূরে আলম সিদ্দিকী (স্বতন্ত্র), এনসিপির আতাউল্লাহ মো. তৌফিকুল ইসলাম, মো. কাজী জাহাঙ্গীর ও আরিফুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের মো. জহিরুল ইসলাম চৌধুরী এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মুহাম্মদ মুহসিনুল হাসান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শাহীন খান, জাতীয় পার্টির মো. জহির উদ্দিন খান, বিএনপির মুশফিকুর রহমান ও কবির আহমেদ ভূঁইয়া, গণঅধিকার পরিষদের মো. জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রফি উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জসিম, জামায়াতের আতাউর রহমান সরকার, নাছির উদ্দিন হাজারী (স্বতন্ত্র), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মো. হাফেজ আলম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে গণফ্রন্টের নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ আশরাফুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নজরুল ইসলাম নজু, কাজী নাজমুল হোসেন (স্বতন্ত্র), বিএনপির আবদুল মান্নান, সিপিবির মো. শাহীন খান, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের নাহিদা জাহান, জামায়াতের আবদুল বাতেন, খেলাফত মজলিশের আমজাদ হোসাইন ও মুছা সিরাজী (স্বতন্ত্র)।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে ইসলামী আন্দোলনের সাঈদ উদ্দিন খান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. হাবিবুর রহমান, শাহ মুর্তজা আলী (স্বতন্ত্র), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. সফিকুল ইসলাম, মো. আবু কায়েস সিকদার (স্বতন্ত্র), গণঅধিকার পরিষদের সফিকুল ইসলাম, আবদুল খালেক (স্বতন্ত্র), মো. মেহেদী হাছান (স্বতন্ত্র), কাজী দবির উদ্দিন (স্বতন্ত্র), মো. সাইদুজ্জামান কামাল (স্বতন্ত্র), গণসংহতি আন্দোলনের মো. জোনায়েদ সাকি, জেএসডির কে এম জাবির, জামায়াতের মো. মহসীন, দেওয়ান মো. নাজমুল হুদা (স্বতন্ত্র) ও ইসলামী ফ্রন্টের আবু নাসের।
রিপোর্টারের নাম 


























