২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘নৃশংস ও বর্বরতম ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করে কমিশন মনে করে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সরকারকে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এই হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিল, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। কমিশন এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক, সামরিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী সংস্কারের জন্য বিস্তৃত প্রস্তাবনা দিয়েছে।
১. প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি ও নেতৃত্ব
- জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল: যেকোনো জাতীয় সংকট বা দুর্যোগে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের নিয়মিত সভা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- সেনাবাহিনী ও রাজনীতি: সশস্ত্রবাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা এবং বাহিনীর ‘ক্লাসিক্যাল রোলের’ বাইরে ব্যবহার না করা নিশ্চিত করতে হবে।
- দলীয় নেতৃত্ব: ব্যক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
- পেশাদারিত্বে কেন্দ্রিক নেতৃত্ব: সশস্ত্রবাহিনীর নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রাখতে হবে।
২. শাস্তি, দায়িত্ব নিরূপণ ও ক্ষতিপূরণ
- অপরাধীদের শাস্তি: কমিশন নির্ধারিত অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ: শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
- সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ: জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, ভাইস অ্যাডমিরাল জহির উদ্দীন আহম্মেদসহ অন্যান্য সাবেক সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করে দায়িত্ব নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
- গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পুনর্মূল্যায়ন: ডিজিএফআই, এনএসআই ও র্যাব বাহিনীর তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে জড়িত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
- ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: নিহত অফিসার ও সৈনিকদের পরিবারকে পূর্ণ সহায়তা, শহীদ ঘোষণা ও বীরত্বের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। আবেগপ্রবণ হয়ে চাকরিচ্যুত করা অফিসারদের পুনর্বাসন এবং বেসামরিক নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩. বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সংস্কার
- নাম পরিবর্তন: বিজিবি নামের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ বর্ডার রাইফেলস’ বা রাইফেলস-সংলগ্ন অন্য নাম দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- অফিসার সংখ্যা বৃদ্ধি: বিজিবির ব্যাটালিয়নগুলোতে অফিসারের অপ্রতুলতা দূর করতে মেজর ও লে. কর্নেল পদবির অফিসারদের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করা। উপপরিচালক পর্যন্ত ৫০ শতাংশ বিজিবি থেকে এবং বাকি অন্য বাহিনী থেকে অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান পদোন্নতি সিস্টেম চালু করা যায়।
- কমান্ড চ্যানেল ও মনোবল: রিজিয়ন কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডারদের নিয়মিত দরবার গ্রহণ করে সৈন্যদের চলমান ঘটনাবলী অবহিত করা।
- গার্ডস সিকিউরিটি ব্যুরো: কোম্পানি পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বর্ডার এলাকায় তথ্য সংগ্রহ ও অসন্তোষ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
- ইন্টেলিজেন্স সংযুক্তি: এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বিজিবির মধ্যে চালু করা এবং গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করা।
- সাংগঠনিক কল্যাণ: বেতন কাঠামো, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসনের সমতা নিশ্চিত করা।
৪. গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও র্যাব সংস্কার
- কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি (সিআইসিসি): গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে।
- এনএসআই ও ডিজিএফআই: দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই-এর দলীয়-রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা এবং বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে তথ্যবিনিময় করে রিয়েল টাইম ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ডিজিএফআই-এর রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে আনা এবং সংস্থার কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ও পদোন্নতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
- পুলিশ ও র্যাব: জাতীয় ক্রান্তিকালে নিজ উদ্যোগে অপরাধ মোকাবেলার সক্ষমতা এবং কোরডন, অপরাধী আটক ও অভিযানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
- এসবি: রিয়েল টাইম ইন্টেলিজেন্স, স্থানীয় জনগণ ও উসকানিদাতা শনাক্তকরণে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম
- আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: শীর্ষ নেতৃত্ব ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সহায়তার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘটনাস্থলের ভিডিও বা ছবি পর্যালোচনা করে মিছিলে নেতৃত্বদানকারীদের শনাক্ত করে আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে।
- গণমাধ্যম: দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, সশস্ত্রবাহিনীর ধারণাগত সমস্যা সমাধান, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক গঠন এবং কেন্দ্রীয় মিডিয়া সমন্বয় সেল গঠন করে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও কৌশলগত সুপারিশ
- রাষ্ট্রীয় নীতি ও সাংবিধানিক সংস্কার: প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা, যেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ আলাদা রাখার আইন প্রণয়ন করা হবে। নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- জাতীয় নিরাপত্তা নীতি: সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার স্বতন্ত্র কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- অর্থনীতি ও স্বায়ত্তশাসন: বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিদেশী সফটওয়্যার নির্ভরতা কমিয়ে কোর ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিরাপদ করা এবং দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
- আন্তর্জাতিক কূটনীতি: ভারত, চীন, আমেরিকা, পাকিস্তানসহ সব অঞ্চলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি গ্রহণ এবং ভারত-বাংলাদেশ নদী নীতি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
- প্রযুক্তি ও তথ্য: ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা, জাতীয় ডেটা কেন্দ্র ও সরকারি সার্ভারের স্বয়ংসম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত, গোয়েন্দা ও সশস্ত্রবাহিনীর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহ করা।
- রাজনৈতিক সংস্কার: নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা। আগের সরকারের মিত্ররা নতুন নৈতিক ও আইনগত মানদণ্ড পূরণ না করা পর্যন্ত ভোটে অংশ নিতে পারবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 























