অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং সর্বাধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দ্রুত প্রসারে দেশের সামগ্রিক আর্থিক লেনদেনের গতিশীলতা বহুগুণ বেড়েছে। তবে প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি এই আধুনিক আর্থিক অবকাঠামোয় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানামুখী সাইবার হামলার ঝুঁকিও। সম্প্রতি বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা জারির পর আগাম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে টানা তিন দিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ওয়েবসাইট। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গোটা আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার নিরাপত্তা ও সার্বিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে গভীর আলোচনা ও উদ্বেগ শুরু হয়েছে।
ব্যাংকার, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং এ খাতের বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে বলছেন, সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট কর্মদিবস বা সীমিত সময়সীমা থাকতে পারে না। সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা দীর্ঘ সরকারি ছুটির মধ্যেও দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সপ্তাহের সাত দিন চব্বিশ ঘণ্টাই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে। সম্ভাব্য ডিজিটাল হামলা কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে অবকাঠামোগত প্রযুক্তিগত দুর্বলতাগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা, সার্ভার ও সফটওয়্যার নিয়মিত আধুনিক নিরাপত্তা প্যাচ দিয়ে হালনাগাদ রাখা, রিয়েল-টাইম নেটওয়ার্ক নজরদারি এবং যেকোনো আকস্মিক বিপর্যয়ে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পুনরুদ্ধারের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত, এই মুহূর্তে দেশের ব্যাংকিং বা সামগ্রিক আর্থিক খাতে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি কিংবা কোনো গণ-আতঙ্কের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
যেকোনো সফল সাইবার হামলার সরাসরি পরিণতিতে ব্যাংকের অনলাইন আর্থিক লেনদেন ও সাধারণ গ্রাহকসেবা আকস্মিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে কোটি কোটি গ্রাহকের অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের গোপনীয়তা। এমনকি মুহূর্তের ব্যবধানে লোপাট হতে পারে প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের অর্থসম্পদ। একটি একক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তার সামান্য দুর্বলতা পুরো জাতীয় আর্থিক ব্যবস্থায় চেইন রিঅ্যাকশনের মতো মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনা। সে সময় অভিনব আন্তর্জাতিক সাইবার হামলার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন রিজার্ভ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ভয়াল ঘটনার ক্ষত ও তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের সাইবার সুরক্ষার নীতিনির্ধারণে আজও সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওয়ান ব্যাংকের চিফ ইনফরমেশন অফিসার এএম মোস্তফা এ বিষয়ে জানান, যেকোনো লম্বা ছুটির সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অতীতেও একাধিকবার দেখা গেছে যে, বড় ছুটি বা দীর্ঘ বন্ধের সুযোগ নিয়েই বৈশ্বিক সাইবার অপরাধী চক্রগুলো সুপরিকল্পিতভাবে তাদের নাশকতামূলক আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করে থাকে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহুল ব্যবহৃত ওয়েব ডেভেলপমেন্ট পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার একটি বড় প্রযুক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সার্বিক সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। তবে এটি নির্দিষ্টভাবে কোনো দেশ বা একক প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করে তৈরি কোনো দুর্বলতা নয়।
এএম মোস্তফা আশ্বস্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ, সফটওয়্যারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করা এবং কালক্ষেপণ না করে নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভাব্য যেকোনো বড় ক্ষতি অনায়াসেই এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এই মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই; তবে উদাসীন না থেকে ঝুঁকি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক প্রযুক্তিগত নজরদারি ও আগাম সুরক্ষামূলক প্রস্তুতি ধরে রাখা আবশ্যক।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব আইসিটি নিরাপত্তানীতির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের আইটি ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মনিটরিং সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় রাখা বাধ্যতামূলক। শুধু হামলা সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ব্যবস্থা নিলে আধুনিক সাইবার যুদ্ধে টিকে থাকা অসম্ভব; বরং হামলার সম্ভাব্য হুমকিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক টুলসের মাধ্যমে অনেক আগেই শনাক্ত করে তা ঠেকানোর পূর্ণ সক্ষমতা থাকতে হবে।
এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান আইসিটি সিকিউরিটি পলিসি গাইডলাইন অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্বক্ষণিক সুরক্ষিত রাখতে সাত স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা বা ‘সেভেন-লেয়ার ডিফেন্স’ শতভাগ কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য। এই সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সাধারণ ছুটির দিনেও এক মুহূর্তের জন্য শিথিল করার সুযোগ নেই। সাইবার নিরাপত্তা সেল ও সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টারকে (এসওসি) ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আধুনিক ঝুঁকিনির্ভর তত্ত্বাবধান কাঠামোর মূল নীতিই হলো হামলার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তাই যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি দ্রুততম সময়ে শনাক্ত এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. ইজাজুল হক জানান, দেশে ক্যাশলেস অর্থনীতি ও ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি যত বেশি সম্প্রসারিত হবে, তার সমান্তরালে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়বে। এই প্রযুক্তিগত ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা গাইডলাইনগুলোর শতভাগ বাস্তবায়ন, ডিজিটাল লেনদেনে সাধারণ গ্রাহকদের সতর্কতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত মূল সফটওয়্যারগুলো নিয়মিত ও সময়মতো আধুনিকায়ন করতে হবে।
ড. ইজাজুল হক আরও জোর দিয়ে বলেন, সাইবার জগতের এই অদৃশ্য ঝুঁকি সফলভাবে মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার অপরাধ দমনকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে একক প্লাটফর্মে একযোগে ও সমন্বিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।
আর্থিক খাতে সাইবার হামলার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—নিয়মিত সিস্টেম পেনিট্রেশন টেস্ট ও সাইবার অডিট পরিচালনা, সফটওয়্যারের ফাঁকফোকর দ্রুত প্যাচ দিয়ে মেরামত, দুই বা ততোধিক ধাপের কঠোর পরিচয় যাচাই (মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন), অননুমোদিত বা সন্দেহজনক যেকোনো প্রবেশাধিকার তাৎক্ষণিক ব্লক করা এবং সার্বক্ষণিক স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক পর্যবেক্ষণ। পাশাপাশি কোনো কারণে মূল সার্ভার আক্রান্ত হলেও যেন কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং তথ্যের নিরাপদ অফ-সাইট ব্যাকআপ রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মিনিটের মধ্যে ডেটা রিকভারি করে স্বাভাবিক সেবা চালুর সুনির্দিষ্ট ‘ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান’ প্রস্তুত রাখা।
বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা—কোনো আন্তর্জাতিক ঝুঁকি দেখা দিলে নিছক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িক বন্ধ রাখা বা সার্কুলার জারি করাই সুরক্ষার চূড়ান্ত সমাধান নয়। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোর-ব্যাংকিং সার্ভার, লেনদেনের সফটওয়্যার ও ডাটাবেজ নেটওয়ার্কের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো আকস্মিক হামলা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং ক্ষতি কাটিয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার নিরাপত্তা নিছক কোনো সাধারণ কারিগরি বিষয় নয়; এটি সরাসরি আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি কোটি কোটি সাধারণ গ্রাহকের পরম আস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হামলা হওয়ার পর তদন্ত করার পুরোনো সংস্কৃতি পরিহার করে আগাম প্রতিরোধ, সার্বক্ষণিক নিশ্ছিদ্র নজরদারি এবং যেকোনো বিপর্যয়ে দ্রুত সেবা পুনরুদ্ধারের মজবুত সক্ষমতা অর্জন করাই এখন বাংলাদেশের গোটা আর্থিক খাতের জন্য প্রধানতম জাতীয় চ্যালেঞ্জ।


























